শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

কনটিকির যাত্রা


মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজারের মত বাসিন্দা থাকে এই দ্বীপটাতে। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের উপরে একটা বিন্দুর মতনই মনে হবে, কেননা আয়তনে হচ্ছে মাত্র ১৬০ বর্গ মাইলের মতন। কিন্তু কি তাঁর এমন মাহাত্ম্য যে ইউনেস্কো সেই দ্বীপটাকে সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহনের গরিমা দিয়েছে। হ্যাঁ, আমি বলছি রাপা নুই বা ইষ্টার দ্বীপের কথা। কি তাঁর সেই বিশেষত্ব। হ্যাঁ এইখানেই আছে সেই সব মোইএরা বা বিশাল বিশাল পাথরের খোদাই করা মানুষের মুখগুলো, যাদের নাম মোই।

 কিনতু অবাক কান্ড আরও লাগে, যখন দেখি এই বিশাল আকারের মুর্তিদের সমূদ্রের উপরে দিয়ে নিয়ে এসে দ্বীপে বসান হয়েছে। তাও এক সার  দিয়ে। এদের মুখ তাকিয়ে আছে সমূদ্র থেকে দ্বীপের ভেতর দিকে, যেন তারা নতুন  কিছু জিনিষ এই দ্বীপে আছে কিনা তাই দেখছে।

কারা এরা বা কাদের তৈরী এই সব মূর্তি গুলো।  কোন কিছু নির্দিষ্ট করে কোথাও লেখা নেই, কিন্তু বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে এই মূর্তিগুলো করা হয়েছে দ্বীপবাসীদের পূর্বপুরুষের স্মরণার্থে। কিন্তু তাহলে আজকে এরা মুখ থুবড়ে পড়ে আছেই বা কেন? মনে হয়  দ্বীপের আদিম অধিবাসীদের মধ্যে আন্তরিক বিরোধের ফলে ঐ মুর্তিগুলোকে ইচ্ছে করে ফেলে দেওয়া হয়েছে। বাচ্চা ছেলেরা খেলায় হেরে গেলে যেমন তাঁর খেলনা ভেঙ্গে ফেলে, সেই রকম অনেকটা।

 বিখ্যাত নরওয়েজিয়ান লেখক থর হেয়ারডাল ( ইনি বিজ্ঞানীও বটে, কিন্তু তাঁর লেখা বই তাঁকে বিজ্ঞানীর থেকে লেখক হিসাবে বেশী সম্মান দিয়েছে।  তাঁর লেখা বই তিনটি হল কন-টিকি আর আকু আকু এবং ফাতু হিভা।)  এই সম্বন্ধে কিছু লিখেছেন, যেটা তাঁর নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। ।  বছর ষাটেক আগে আমার পড়া প্রথম বই দুটো, কিন্তু তাদের আকর্ষন আমার কাছে এখনও প্রবল হয়ে আছে। দেখি তাঁর থেকে কিছু আপনাদের জন্য জোগাতে পারি কিনা।

থর হেয়ারডালের জন্ম ১৯১৪ খৃষ্টাব্দে। ভূগোল, জীব এবং প্রানী বিজ্ঞান এবং নৃতত্বের উপরে তাঁর জ্ঞানএর সাথে তাঁর এডভেঞ্চার করার নেশা তাঁকে নরওয়ে থেকে পেরু, আবার সেখান থেকে এক নৌকো তৈরী করে প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে টুয়ামোটো দ্বীপপুঞ্জে যেতে বাধ্য করে। সেই সমূদ্রযাত্রার বিবরণ তিনি দিয়েছেন তাঁর লেখা কন টিকি বইয়ে।

থর আর তার স্ত্রী লিভ যখন মারকুইস দ্বীপপুঞ্জের ফাতু হিভা দ্বীপে হনিমুন করতে চলে গিয়েছিলেন তখন থেকে এর সূত্রপাত। অবশ্যি হনিমুনের চেয়েও সেটা ছিল আধুনিক সভ্যতা আর সমাজের উপরে থরের বিরাগ। তাই একেবারে আদিম অধিবাসীদের মতন তাঁর নব বিবাহিত স্ত্রীকে সাথে নিয়ে চলে গেছিলেন ফাতু হিভায়। প্রথম অভিজ্ঞতা তাঁর এই আদিম জীবনের মধ্যে  এসে পড়ার হয় যখন তাঁর তাবুর উপরে গাছের থেকে এক পাকা নারকেলের পতন হয় এবং তাবুর সর্বনাশ হয়। বাধ্য হয়ে তাদের আশ্রয় নিতে হয় ওখানকার অধিবাসীদের মতন এক কুড়ে ঘরে, সাহায্য নিতে হয় স্থানীয় অধিবাসীদের তাদের জীবন ধারার সাথে।

 একসন্ধ্যায় সেই পলিনেশিয়ান দ্বীপে, সমূদ্রের ধারে বসে ঢেউএর ভেঙ্গে পড়া আর তার ফেনিল জলরাশি দেখতে দেখতে  আমাকে স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন,” আচ্ছা এই দ্বীপের অন্য দিকেও কি এই রকম ভাবেই ঢেউ ভেঙ্গে পড়ছে”? আমি বললাম, “ তা কেন। ওটা তো স্রোতের উলটো দিকে, মানে পশ্চিম দিকে। ওদিকের সমূদ্র শান্ত”। সামনে আমার বসে ছিল এক স্থানীয় আদিবাসী। নাম তাঁর তেই তেহুয়া। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়ল যে তোমরা কথা থেকে এসেছ যে বেড়ালের ছবি তোমাদের পুর্ব পুরুষেরা আঁকতে পেরেছে, বেড়াল তো এখানে হয় না। তখন উত্তর পাই ‘তে ফিতি” (পূর্ব দিক) থেকে আমরা এসেছি।  বালিতে আকি বুকি কাটতে কাটতে সে বলে উঠল “টিকি।  আমাদের সর্দার আর ভগবান। তিনিই আমাদের এখানে নিয়ে এসেছেন। তার আগে আমরা সমূদ্রের ওপারে এক বিরাট পাহাড়ী দেশে বাস করতাম।“ রাতে শুয়ে আমার মনে যে কথাটা বার বার আসতে লাগলো সেটা হচ্ছে যে এই মূর্তিগুলোর আদল প্রায় সেই দক্ষিন আমেরিকার জঙ্গলের আদিম মুর্তির মত, তবে কি এগুলো সেখান থেকে বা সেখানকার লোকে বানিয়েছে।

এই চিন্তা আমার মনে নাড়া দিয়ে গেল। যেখানে কোন নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না সেখানেই শুরু হয় কল্পনা। সমুদ্রের ওপারে মানে দক্ষিণ আমেরিকায়। কিন্তু এই দীর্ঘ ৪৫০০ মাইল চওড়া প্রশান্ত মহাসাগর তারা পার হয়েছিল কি ভাবে? তবে কি কোন স্থল যোগসুত্র ছিল এই প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জ আর দক্ষিন আমেরিকা মধ্যে, যা এখান আর নেই।

বিজ্ঞানীরা যখন কোন জায়গার সাথে তাঁর বাসিন্দাদের সূত্র খোজেন তখন তারা অন্য জীব জন্তুর সাথে আশপাশের জায়গার মিল খুজতে থাকেন। এইখানে কিন্তু দেখা গেল যে দ্বীপে সে সমস্ত জন্তুর হাড় পাওয়া যাচ্ছে সেটা হচ্ছে ইদুরের, যে ধরনের ইদুর পেরুতে পাওয়া যায়। তাছাড়া স্থানীয় অধিবাসীদের চেহারা, হাওয়াই দ্বীপ বা অস্ট্রেলীয় চেহারার সাথে না মিল রেখে ইনকাদের সাথে কিছুটা মিল পাওয়া যাচ্ছে।  দ্বীপপুঞ্জের অন্য দ্বীপের লোকেদের বংশ পরম্পরা, তারা  ইনকাদের মত দড়িতে গিঁঠ গুনে গুনে বলতে পারছিল। তবে কি ওরা ইনকাদের থেকেই এসেছে।

আফ্রিকার থেকে দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ব উপকূল, আবার তার পরে আমেরিকার পশ্চিম উপকূল থেকে পলিনেশিয়ান দ্বীপগুলোর দিকে এক স্রোত প্রতিনিয়ত বয়ে চলেছে। এটা ভর করে লোকে তো জাহাজেও আসতে পারে। কিন্তু কাঠের জাহাজের প্রচলন কলম্বাসের আমেরিকা আসার আগে হয়নি। কিন্তু তাঁর আগেও তো লোকে সমূদ্রে যাত্রা করেছে। কি ভাবে দেখতে গিয়ে দেখা গেল যে বালসা কাঠের ভেলা বানিয়ে তাতে করে সমূদ্রে যাত্রা করার কথা ইতিহাসে আছে। বালসা এক ধরণের গাছ, যার কাঠ হয় অত্যন্ত হাল্কা, আগে এরোপ্লেন বানানোর কাজে এর ব্যবহার খুব ছিল। হাল্কা ধাতু আবিস্কারের পরে আর এটা ব্যবহার হয়না, তবুও কিছুদিন আগে পর্যন্ত খেলনা প্লেন (মডেল এরোপ্লেন) তৈরী হত এই কাঠ দিয়ে।

যখন ইউরোপীয়েরা এই সব দ্বীপগুলোকে আবিস্কার (?) করল তখন কিন্তু দেখা গেল যেসব জায়গাতে মানুষেরা আছে, সেখানে কিন্তু লোকে চাষ আবাদ করছে, জন্তু জানোয়ার অন্য জায়গার মতনই পোষ মানিয়ে, তাদের দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। তবে এটা কিসের আবিস্কার। যারা এখানে আছে তাঁর তো এই ইউরোপীয়দের আগেই এসে এটাকে আবিস্কার করেছে।

এটা দেখা গেছিল যে এই দ্বীপগুলোতে ৫০০ থেকে ১১০০ খৃষ্টাব্দের মধ্যেই বসতি হয়েছে তাঁর আগে এই দ্বীপগুলোতে মানুষেরা থাকত না। এর আদিম বাসিন্দাদের চেহারার সাথে কিন্তু পলিনেশীয়, বা নিগ্রয়েড অথবা মোঙ্গলয়েড জনগোষ্ঠির মিল নেই। বরং এদের সাথে মিল খুজে পাওয়া গেছে ভারতের (সিন্ধু নদের অববাহিকা র এলাকা) লোকেদের সাথে আর ইনকাদের সাথে। কিন্তু ভারতের থেকে এখানে কোন জনজাতির আসা সম্ভব বলে মনে হয়না।

ঘুরে ফিরে যখন সেই নিশানাটা ইনকাদের দিকেই যাচ্ছে তখন দেখা গেল যে স্পেনীয়দের আসার আগে যে ইনকাদের পিরামিড, নগর সব পাহাড়ের উপরে ছিল সেগুলো কিন্তু এই প্রজন্মের ইনকাদের তৈরী নয়। এগুলো তৈরী করে গেছেন তাদের আগের কোন এক প্রজন্ম যাদের সাথে এই প্রজন্মের ইনকাদের চেহারার মিল খুব বেশী নেই।
“এরা উত্তরদিক থেকে এসেছিলেন, আর আমাদের কি ভাবে কি  কি করতে হয়, এই সব ইঞ্জিনিয়ারিং, স্থাপত্যকলা শিক্ষা দিয়ে গেলেন। লম্বা দেখতে, মুখে সাধারণত দাড়ি থাকত আর দেখতে ফর্সা রঙ। তাঁর পর তারা আবার পশ্চিম দিকে সমূদ্রের ওপারে হঠাত চলে গেলেন”। এই খবরই কিন্তু জিজ্ঞাসা করে পাওয়া গেছিল পরের প্রজন্মের ইনকাদের কাছ থেকে। কিন্তু পেরুর পশ্চিমে তো প্রশান্ত মহাসাগর। তবে কি তারা সাগর পাড়ি দিয়েছিলেন। ওদিকে পলিনেশীয়ান দ্বীপগুলোতেও দেখা গেল লোকেরা বেশ ফর্সা, লম্বা এবং সাধারনত দাড়ি যুক্ত মুখমন্ডল।

তাহলে এই টিকি কে, যিনি তাঁর সাথে সারা অনুগামীদের নিয়ে এই রাপা নুইতে চলে এসেছিলেন। খুজতে খুজতে পাওয়া গেল পেরুতে ইনকাদের সুর্যের দেবতা ভিরোকচার নাম। অবশ্যি ভিরোকচার আদি নাম ছিল টিকি কন টিকি বা ইল্লা টিকি। এও কথাতে পাওয়া গেল যে এই কন টিকির অনুগামীদেরকে টিটিকাকা হ্রদের ধারে এক কারি সম্প্রদায় যুদ্ধে হারিয়ে দ্যায়। এই টিটিকাকা হ্রদের পাড়েই কনটিকির তৈরী বিশাল বিশাল মনুমেন্ট আজ দেখতে পাওয়া যায়। যুদ্ধে হেরে কন টিকি তাঁর অনুগামীদের যাদের বাঁচাতে পেরেছিলন তাদের নিয়ে সাগর পার হউএ পূর্ব দিকে চলে যান। তাহলে বোঝা যাচ্ছে কনটিকি হছে সেই সুর্যদেবতার প্রধান পুরোহিত।
থরের একটা লক্ষ পূরন হল কিন্তু যতক্ষন না কেউ সাহস করে এই দীর্ঘ সাডে চার হাজার মাইলের সমূদ্রপাড়ি না দিচ্ছে ততক্ষন ঐ  কন টিকির কথা আর কেউ বিশ্বাস করবে না। শুরু হল তাঁর প্রস্তুতি। সমূদ্র পার হয়ে পলিনেশিয়ান দ্বীপে যাবার।


কিন্তু তাঁর আগে তিনি যে তাঁর যুক্তি দিয়ে যে প্রস্তাবনা লিখেছিলেন আর বিভিন্ন বিজ্ঞানীদের কাছে পাঠিয়ে ছিলেন তাদের কাছ থেকে বিশেষ কিছু উৎসাহ পান নি। ইতিমধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপের এদিক থেকে ওদিকে ধ্বংসলীলা চালিয়ে বেড়াচ্ছিল।  যখন নরওয়ের উপর জার্মান সৈন্য বাহিনী হামলা করে দখল করে নিল থর তাঁর সব কিছু বন্ধ করে সেই যুদ্ধে যোগ দিলেন।

১৯৪৫ সালে যুদ্ধ থামার পরে আবার থর তাঁর ঐ পুরনো ভাবনা নিয়ে চিন্তা শুরু করলেন। থাকছিলেন তখন নিউইয়র্কের নরওয়েজিয়াব নাবিকদের জন্য তৈরী আবাসে, যেটা সস্তা  এবং নরওয়েজিয়ান খাবার পাবার একটা ভাল জায়গা।

এক বিখ্যাত বিজ্ঞানীর কাছ থেকে তিনি তাঁর পান্ডুলিপি ফেরত পেলেন আর তাঁর সাথে আখ্যা পেলেন যে প্রমাণ না দিয়ে এই সব প্রস্তাবনার কোন দাম নেই। থর নিরাশ হলেন কিন্তু হাল ছাড়লেন না,। এক দিন আর এক বন্ধু, যার সারা জীবন প্রায় সমূদ্রের উপরেই কেটেছে, তাঁর সাথে বিকেলের চায়ের সময় কথায় কথায় জিজ্ঞেস করেই ফেললেন যে বালসা কাঠের ভেলাতে করে কি আমেরিকা থেকে পলিনেশিয়া যাওয়া সম্ভব। বন্ধুর কাছ থেকে হ্যাঁ উত্তর তাঁকে যে কতটা খুশী করেছিল তা কিন্তু তিনি তাঁর বইএ লিখেছেন।
 কিন্তু যখন তিনি বললেন যে তিনি ভাবছেন এই রকম একটা ভেলাতে চড়ে যাবেন তখন কিন্তু বন্ধু তাঁকে বারণ করলেন। বললেন যদিও তিনি বিশ্বাস করছেন যে ইনকাদের দল এই রকম বালসা কাঠের ভেলাতে চড়ে মহাসাগরে পাড়ি দিয়েছিল, কিন্তু তারা গেছিল দল বেঁধে। একটা ভেলা ডুবে গেলে অন্য ভেলার লোকেরা এদের বাঁচানোর কাজ করেছে।

এই রকম সময়ে তাঁর সেখা হল ন্যুট ওয়াটজিঙ্গারের সাথে। ন্যুট পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, কথায় কথায় তাঁকে থর বললেন এই ব্যপারে। ন্যুট তাতে বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। থর তাঁর আগেই, অভিযাত্রী হিসাবে নিউইয়র্কের এক্সপ্লোরার ক্লাবের সদস্য হয়ে গেছিলেন। সেখানে পিটার ফ্রুসেনের সামনে একদিন এয়ার মেটেরিয়াল কমান্ড থেকে যুদ্ধে ব্যবহৃত এবং পরে তাঁর উপরে আরও উন্নতি করে জিনিষ গুলোকে দেখান হচ্ছিল।

অভিযাত্রীদের কাছে এই জিনিষগুলোর উপকারিতা নিয়ে হেরমানের সাথে কথা হতে হতে হারমান প্রস্তাব দিল তাহলে চল না আমিও সাথে যাই। কি কি জিনিষের দরকার তাঁর একটা লিষ্ট তৈরী হতে লাগল।
অভিযানের জন্য মূল দরকারী জিনিষ টাকা। এক জায়গাথেকে আশার খবর পেলেন যে সমস্ত খবভর তাদেরকেই একমাত্র দিলতে হবে সে সুবাদে তারা তাকা দেবেন। কিন্তু কয়েকদিন বাদে সে টাকাও পাওয়া গেল না । ভদ্রলোক তাঁর কথার খেলাপ করলেন। শেষ পর্যন্ত নরওয়ে সরকারের কাছ থেকে ধার হিসাবে থর কিছু টাকা পেলেন।

নরওয়ের দূতাবাস থেকে আমেরিকার পেন্টাগনের কাছে লেখা চিঠি নিয়ে থর আর হারমান দেখা করতে গেলেন এই সামরিক দফতরে।  বিশাল দফতর যেখানে প্রায় ৩৫ হাজারের উপর লোকে কাজ করেন আর বাড়ীটাতে মাইল ষোলর মতন হবে বারান্দার লম্বাই। কিন্তু আসল কথা হল যে তারা সৈনিক দফতর থেকে তাদের দরকার মতন, আপতকালীন উদ্ধারের জিনিষপত্র, টিন বন্ধ খাবার ইত্যাদি পেয়ে গেলেন।

এবার দরকার দুটি জিনিষের। প্রথম  হচ্ছে বালসা গাছের গুড়ি প্রয়োজন  মত লম্বা। ইনকাদের সময়ে লোহার ব্যবহার ছিল না কাজেই বালসা কাঠের তক্তা দিয়ে তৈরি করা যাবে না। কিন্তু পেরুতে গিয়ে দেখা গেল সে জিনিষের অসুবিধা। প্রথমত পেরুর জঙ্গল থেকে সমূদ্র উপকুলে ঐ গাছের গুঁড়ি আনতে গেলে অন্য দেশ ইকোয়েডরের উপর দিয়ে আসতে হবে। ইনকাদের থেকে একটা বেশি অসুবিধা কেননা তখনতো আর সীমান্ত রক্ষার জন্য কোন কাঁটা তারের ব্যপার ছিল না।

তাঁর চেয়েও বেশী অসুবিধা সামনে নিয়ে এল সদ্য শেষ হওয়া বিশ্বযুদ্ধ।  উপকুলের কাছের সমস্ত এলাকার বালসা গাছ কেটে এরোপ্লেন তৈরির জন্য ব্যবহার করা হয়ে গেছে। দরকার মত লম্বা গুঁড়ি অমিল। আন্ডিজ পাহাড়ের নীচের দিকে ঘন জঙ্গলে হয়ত পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু বর্ষা নেমে গেছে বলে সেখান যাওয়া প্রায় অসম্ভব। সবাই মত দিল বর্ষা থামলে যত চাই তত বালসা পাওয়া যাবে। থরের সেটা অপছন্দ।

থর ভাবলেন বৃষ্টির জন্য উপকুলের দিক থেকে, মানে গুইয়াকুইলের দিক থেকে জঙ্গলের রাস্তা অগম্য হয়ে থাকতে পারে কিন্তু আন্ডিজ পাহাড়ের উপর থেকে অত অসুবিধা হবার কথা নয়। চলে গেলেন পাহাড়ের উপরে শহর কুইটোতে। সেখান থেকে এক মার্কিন সেনা বাহিনীর জিপে করে কখন পাহাডী গলিপথ ধরে, আবার কখনবা স্রেফ পাকদন্ডীর মতন রাস্তা দিয়ে এলেন বালসার জঙ্গলে। কাঠের সমস্যা মিটল।

আর দ্বিতীয় চিন্তা ছিল সহযাত্রী নির্বাচনের। আনুমানিক হিসাবে তাদের লাগার কথা তিন মাস, বাড়িয়ে নিয়ে সেটা চার মাস। এই দীর্ঘ সময় সহযাত্রীদের মধ্যে একটা সামাজিক সদ্ভাব না গড়ে উঠলে তাদের টিকে থাকা সম্ভব নয়। অনেক হিসাব করে নুট তাঁর যুদ্ধের সময়কালীন সাথী টরষ্টেইন আর হ্যাগল্যান্ডকে আসতে বললেন।

ভেলা বানানোর জন্য থর সাহায্য নিয়েছিলেন স্পেনীয় চিত্রকরদের যারা  ইনকাদের কাছ থেকে তাদের ভেলার চেহারাটা দেখে চিত্রবদ্ধ করেছিলেন। যাত্রার পথে প্রত্যেক চার ঘন্টা অন্তর একজন যাত্রীর জেগে থাকবার কথা, কাজেই সব শুদ্ধ যেকোন এক সময়ে পাঁচ জনের শোয়ার  জায়গা থাকা দরকার, তা ছাড়া তাদের সাজসরঞ্জাম, রশদ ইত্যাদি রাখার জায়গা দরকার। কাজেই ভেলার আয়তন করা হল ৪৫ ফুট(প্রায় ১৩ মি) লম্বা আর ১৮ ফুট (সাড়ে ৫ মি) চওড়া।  লম্বা দিকে ৯টা বালসা কাঠের গুঁড়ি, ২ ফুট (৬০ সেমী) বেধের এক সাথে বাঁধা  হল শনের দড়ি দিয়ে। প্রায় সোয়া ইঞ্চি (৩ সেমী) মোটা দড়ি নেওয়া হল। ভেলার আড়ের দিকে তাকে শক্তপোক্ত করার জন্য ১৮ ফুট (সাড়ে ৫ মি) লম্বা আর ১ ফুট (৩০ সেমি) বেধের গুঁড়ি ৩ ফুট (প্রায় ১ মি) দূর দূরে  দডি দিয়ে বাঁধা হল। ম্যানগ্রোভ গাছের কাঠ দিয়ে একটার সাথে আর একটাকে বেঁধে  ২৯ ফুট উচু (প্রায় ৯ মিটার) মাস্তুল বানাল হল যার পায়া দুটি ভেলার দুদিক থেকে উঠে ইংরাজী A মত চেহারার হল। ভেলার বালসা গুড়িগুলোর ফাঁক দিয়ে দু ফিট চওড়া পাইন গাছের তক্তাগুলো গুজে দেওয়া হোল। ভেলাকে জলের সাথে সমান্তরাল রাখার জন্য। ভেলার সামনের দিকে জলের ঢেউএর জন্য বেড়ার বন্দোবস্ত করা হল।

থাকার জায়গার জন্য মাস্তুলের গায়েই বাঁশের দর্মা দিয়ে একটা সাধারণ ঘরের মাপে ১৪ ফুট লম্বা আর ৮ ফুট চওড়া ঘর তৈরী করা হল। তাতে  কলাপাতার ছাউনী দেওয়া হল, দেয়াল হল ৪/৫ ফিটের মত উচু।
এক ১৯ ফুট লম্বা ম্যানগ্রোভের কাঠে ফার গাছের তক্তা লাগিয়ে তৈরী করা হল দিশা বদল করার জন্য হাল।  স্রোতের সাথে সাথে বাতাসের সাহায্যের জন্য একটা বড় পালের ব্যবহার করা হল। ১৬ ফুট চওড়া আর ১৮ ফুট উচু পাল লাগান হল। তাতে আঁকা হল কনটিকি বা সূর্য দেবতার ছবি।


সমস্ত ভেলাটা আজ কনটিকি যাদুঘরে রাখা আছে।   যাত্রীদের কেউই আজ আর জীবিত নেই। একমাত্র যাত্রী যিনি এই অভিযান সম্পূর্ণ করে উঠতে পারেন নি তিনি হলেন এক টিয়া পাখী, লরিটা। পথে এক বিশাল ঢেউ তাকে ভেলার থেকে টেনে কোথায় নিয়ে চলে যায়। তাঁর দেহের কিছু পালক আজ ঐ যাদুঘরে রাখা আছে ভেলার সাথে।
কিন্তু ঐ আন্ডিজ পাহাড়ের উপরে আর ভেলা বানানো যাবে না। কাজেই এই গুড়িগুলোকে পাঠান হল লিমার নৌসেনার জাহাজ বানানোর কারখানাতে। সেখানেই আস্তে আস্তে তৈরী হতে লাগল কন টিকি। ন্যুট অবশ্যি একটা বিষয়ে সাহস দেখান নি যে শুধুমাত্র ছবি অনুযায়ী ভেলা বানিয়ে তাতেই যাত্রা শুরু করবেন। বহুবার তাঁর পরীক্ষা জলের উপরে করেছেন যাতে তিনি নিজে নিশ্চিত হন যে ভেলাটা সমূদ্রযাত্রার জন্য উপযোগী হচ্ছে।
ইতিমধ্যে তাঁর সহযাত্রী নির্বাচন সম্পুর্ণ করা হয়েছে। প্রথম সহযাত্রি হলেন হেরম্যান ওয়াটজিঙ্গার। পেশায় ইঞ্জিনিয়ার, কোম্পানির কাজে নিউইয়র্কে এসেছিলেন আর আচমকাই তারা সাথে থরের আলাপ পরিচয় তাকে এই অভিযানে সামিল করে নেয়। তাঁর সাধের চাকরী আর পরিবার পরিজন নরওয়েতে ছেড়ে অভিযানে যোগ দিলেন।
দ্বিতীয় আর তৃতীয় সহযোগী হিসাবে এলেন ন্যুট হ্যাগল্যান্ড আর টরষ্টেইন রাব্বি। এদের দুজনের সাথ থরের পরিচয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় থেকে। দুজনেই রেডিও সম্প্রচারের ব্যাপারে বিশেষ ভাবে প্রশিক্ষিত আর জার্মান সেনাদের লুকিয়ে জাহাজ বিসমার্কের খবর পাঠানর কাজ ছিল এঁদের।
আর চতুর্থ সহযাত্রী হলেন থরের বাল্যবন্ধু এরিক হেসেলবার্গ। দক্ষ নাবিক, এর আগেই তাঁর বার কয়েক সারা পৃথিবী জাহাজে ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা আছে। তাঁর চেয়ে বড় কথা ইনি ছিলেন একজন  শিল্পী। কনটিকি ভেলার পালের উপরে আঁকা সুর্যদেবের মুখের ছবি ইনিই একেছিলেন।
আর শেষজন হলেন বেঙ্গট ড্যানিয়েলসন, উপসালা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসীদের সম্বন্ধে তাঁর গবেষনা চলছিল। হঠাত তিনি এসে থরের সাথে যোগাযোগ করে এই যাত্রায় সহযোগী হবার ইচ্ছে প্রকাশ করেন আর যোগ দেন। হয়ে গেল মোট ছজন অভিযাত্রীর পরিচয়।
হ্যাঁ আরও একজন ছিলেন যাত্রা শুরুতে, তিনি হলেন টিয়া পাখী লরিটা। তাঁর পক্ষে এই যাত্রা সম্পূর্ণ করার সৌভাগ্য হয় নি।
তারিখটা ছিল ১৯৪৭ সালের ২৮সে এপ্রিল।   লিমার শহরতলীর নৌসেনার আড্ডা কাল্লাও  থেকে কনটিকির যাত্রা শুরু হল। উপকূলের কাছে অন্য জাহাজ বা নৌকোর সাথে টক্কর না লাগে সে জন্য সমূদ্রের মধ্যে ৫০ সামুদ্রিক মাইল দূর পর্যন্ত তাকে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া হল। এইবার কনটিকি তাঁর নিজের ক্ষমতা দেখিয়ে চলতে শুরু করল।  দীর্ঘ ১০১ দিন বাদে ১৯৪৭ সালের আগষ্ট মাসের ৭ তারিখে  টুয়ামোটো  দ্বীপপুঞ্জের রাওরিয়াতে এসে পাড়ে ধাক্কা খেল। ক্ষতি হল মাস্তুলটা ভেঙ্গে ড্যানিয়েলসনের উপরে পড়া। ভারতের স্বাধীনতার আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি ছিল। পৌছনোর ৪ দিন বাদে পাশের দ্বীপের অধিবাসীরা এসে তাদের আর কনটিকি ভেলাটাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
কনটিকির যাত্রা সমাপ্ত হল। থর প্রমান করে দিলেন যে পলিনেশিয়ার দ্বীপ সমূহের সাথে দক্ষিণ আমেরিকার যোগাযোগ ছিল। যদিও তাঁর মূল বক্তব্য সঠিক ভাবে এখনও প্রমানিত হয়নি, কিন্তু তাকে নস্যাত করাও যায়নি।
যাত্রার পূর্ণ বিবরণ আর তাঁর সাথে তোলা ছবি নিয়ে পরে বই বার হল কনটিকি। আমার লেখা পড়ে বইখানা অন্তত লাইব্রেরি থেকে এনে পড়লে আমার আনন্দ বাড়বে। যাত্রার বিবরণ এখন কপিরাইট আইনের আওতায় থাকার জন্য দিতে পারছি না। ছবি যা কিছু দিচ্ছি  উইকিমিডিয়ার সৌজন্যে।
কনটিকির দেখাদেখি আরও অনেক সমুদ্রে অভিযান হয়েছে।  কনটিকির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে এবং তাঁর সাথে পলিনেশিয়া থেকে আমেরিকায় আসার  জন্য  এক বিশেষ ডাক টিকিট বার করাও হয় ১৯৬২ খৃষ্টাব্দে।
এইখানে বলে রাখি প্রখ্যাত সাতারু মিহির সেনের উতসাহে পশ্চিমবঙ্গের অভিযাত্রিক ক্লাবের পরিচালনায় দাঁড় টানা নৌকোতে গঙ্গাসাগর থেকে আন্দামান দ্বীপের যাত্রা হয়েছিল। তাঁর পরে কথা ছিল পরাদীপ থেকে বালী পর্যন্ত এক অভিযানের। ঠিক জানা নেই সেটা হয়েছিল কিনা।


শুক্রবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

ব্যাঙ বন্ধু দুজনের গল্প


অনেক দিন আগের কথা। জাপানের ওসাকা শহরের এক নালার মধ্যে থাকত এক ব্যাঙ। আর আর এক ব্যাঙ থাকতো কিয়োটো শহরের পাশ দিয়ে যে ছোট্ট জলের ধারা বয়ে যায় তারই পাশে এক মাঠের মধ্যে।। কেউ কাউকে চেনেও না, কেননা তারা তো আর বাইরের শহরে যায় নি। কিন্তু মজার ব্যপার হল এই যে দুজনের মনেই একই সাথে কি এক অদ্ভুত চিন্তা এল, যে পৃথিবীর অন্য জায়গাগুলো একবার না হয় ঘুরেই দেখা যাক। কিয়োটোর ব্যাঙ ভাবল ওসাকা গেলে কি রকম হয়, আর ঠিক সেই সময়েই ওসাকার ব্যাঙ্গের ইচ্ছে হল যে কিয়োটো গিয়ে মিকাডোর প্রাসাদের চেহারাটা একবার দেখেই না হয় আসা যাক।

আর এক শুভ সকালে তারা নানান দিক বিচার করে দিল রওয়ানা, দুজনে দেশের দুই প্রান্ত থেকে। সেই রাস্তা ধরে যেটা ওসাকা থেকে কিয়োটো পর্যন্ত টানা চলে গেছে। অনেক দূরত্ব কিন্তু দুটো শহরের মধ্যে।  আর ব্যাঙ্গের ব্যপারতো। ছোট ছোট লাফ মেরে তারা আর একবারে কতইবা দূরে যেতে পারবে। শুধু তাই নয়। তাদের একটা পাহাড়ও পেরোতে হবে যে।

কিন্তু সব ভাল যার শেষ ভাল। এক সময়ে তারা সেই রাস্তা ধরে চলতে চলতে সেই পাহাড়ের মাথায় গিয়ে পৌছাল। আরও অবাক হল তারা যখন দেখতে পেল সামনে দাঁড়িয়ে আছে তারই মতন আর একজন ব্যাঙ। একজন অন্য জনের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। কোন কথা নেই।

তার পরে দুজনেই একসাথে বলে ঊঠল, আমি দূরের শহরটাকে দেখতে বেড়িয়েছি। আর এই উচু পাহাড়টা চড়তে গিয়ে বেশ হাফিয়েও গেছি। একটু বিশ্রাম নেওয়া যাক।

বসে গেল দুজনে একটু গড়িয়ে নিতে। আমাদের মতন বিছানা নেই তাই ঘাসের উপারেই। একথা ওকথা হতে হতে দুজনের মনের কথাটা বেড়িয়েই পড়ল। “হায়রে যদি আমরা এর একটু বড় হতাম, একটু মাথায় উচু হতাম, তবে এখান থেকেই সামনের শহর দুটোকে দেখতে পেতাম। আর তাহলে আমরা বুঝতে পারতাম যে কষ্ট করে যাবার কোন দরকার আছে কিনা।

কিয়োটোর ব্যাঙ বলে খুব সোজা আমরা একজন পেছনে পায়ে ভর দিয়ে দাডাই আর আরেকজন তাঁর ঘাড়ের উপরে পেছনএর পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াক। তাহলে আমরা অনেক লম্বা হয়ে যাব আর দেখতে পাব।
বুদ্ধি টা ওসাকার ব্যাঙ্গের মাথায় চড়াং করে খেলল, খুব ভাল আইডিয়া তো। অতএব তাই তারা করল, ওসাকার ব্যাঙ কিয়োটোর দিকে মুখ করে আর কিয়োটোর ব্যাঙ ওসাকার দিকে মুখ করে খাড়া হয়ে গেল। আর তখুনি তারা দূরে একটা শহর দেখতে পেল।

মজার ব্যাপার হল ব্যাঙ্গের চোখ তো পিঠের দিকে থাকে, তাই ওসাকার ব্যাঙ কিয়োটোর দিকে মুখ করলেও দেখল তার ওসাকা আর সেই রকম কিয়োটোর ব্যাঙ দেখল কিয়োটো।

দুজনেই তারা সমস্বরে বলে উঠল আরে বাস। ওসাকা তো দেখতে একেবারে কিয়োটো আর অন্য জনে বলে উঠল আরে কিয়োটো তো দেখতে একেবার ওসাকা।


দুজনেই ভাবল, তাহলে আর গিয়ে কি লাভ। এত দূরের শহর যদি আমার শহরের মতই হয় তবে আর কষ্ট করে লাভ কি। দুজনে একে অন্যের সাথে গলা মিলিয়ে আবার নিজের শহরের দিকে ফেরত রওয়ানা দিল। মনে মনে বলতে লাগল বেকার এত কষ্ট করলাম। একেবারে এক রকমেরই দেখতে ঐ শহরটা। আমার শহরেই আমি ভাল আছি।

শনিবার, ২৩ আগস্ট, ২০১৪

আমাতেরাসুর গল্প

 সুর্যের দেবী ছিলেন আমাতেরাসু। তাঁর সৌন্দর্যের কথা শুধু জাপান নয় সারা বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছিল।  আর ওদিকে ঝড়ের দেবতা ছিলেন তাঁর ভাই সুসানো-ও। কোনকিছু নড়াতে হলে তাঁর কোন জুড়ি ছিল না। তাড়াহুড়ো করে সবকিছু ভন্ডুল করে দিতেও তাঁর কোন জুড়ি ছিল না।

এই সুসানো-ও একদিন তাঁর বোনের সাথে দেখা করতে গেলেন স্বর্গের রাজ্যে। আসলে তাঁর যাবার কথা ছিল তাঁর মার সাথে দেখা করবার, মৃত্যুপূরীতে গিয়ে, কিন্তু রাস্তায় অনেক ভয়ের কথা শুনে তাঁর মনে একটু ভয় হয়ে গেছিল। তাই সে ভেবেছিল যে তাঁর এই জ্ঞানী বোনের সাথে কিছু  সময় কাটিয়ে নিলে তাঁর মনের সাহস বেড়ে যাবে।
কিন্তু সুসানো-ওর ব্যপার তো। তাড়াহুড়ো  করে যেতে গিয়ে সে আকাশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্ত পর্যন্ত বিদ্যুতের রেখা টেনে মেঘের গর্জনে সবাইকে কাপিয়ে, (এমনকি পাহাড়পর্বত পর্যন্ত কেপে ঊঠেছিল), ভয় পাইয়ে দিলেন। এই ভাবে সুসানো-ও গিয়ে পৌছালেন আমা বা আমাতেরাসুর কাছে। আমাতেরাসু  পর্যন্ত ভয় পেয়ে গেছিলেন।

নিজেকে শক্ত করে আমাতেরাসু হাতে একটা ধনুক আর কাঁধে তীর ভর্তি তূনীর নিয়ে সুসানো-ওর সাথে দেখা করার জন্য বেড়িয়ে এলেন। চোখে মুখে বেশ রাগের লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল আমাতেরাসুর। বলে উঠলেন, কি ব্যপার। সবাইকে চমকে দিয়ে ভয় পাইয়ে এটা কি হচ্ছে তোমার

যদিও সুসানো-ওর এই ধরনের অভ্যর্থনা ভাল লাগেনি, তবুও তিনি হাসিমুখে বলে উঠলেন, সুন্দরী বোন আমাতেরাসু। তোমাদের কাউকে ভয় দেখাতে আমি চাই নি। তোমার সাথে একটু দেখা করে যাবার ইচ্ছেই মনে আছে, আসলে আমি তো  মার সাথে দেখা করার জন্য পাতালপূরীতে যাচ্ছি তাই তাঁর আগে তোমার সাথে একটু দেখা করতে এলাম

কথাটা আমাতেরাসুর মনে ধরলেও সে সুসানো-ওকে একটু যাচাই করে দেখতে চাইল। কিন্তু এর মধ্যেই সুসানো-ও বলে উঠলেন, জাপানের এই পূণ্যভুমিতে ভাল ভাবে শাসন করবার জন্য আমাদের গোটাকয়েক দেব দেবী তৈরী করা হলে ভাল হয় না কি? আর তাঁর জন্য তাহলে আমাকে এখানে কিছুদিন থেকে যেতে হয়।  আসলে সুসানো-ওর মনে পাতালপূরীতে যাবার ভয়টা কিছুতেই কাটছিল না।

আমাতেরাসু রাজী হয়ে গেলেন। আর তখন সুসানো-ওর তলোয়ারটাকে নিয়ে তিন টুকরোতে ভেঙ্গে ফেললেন। আর তাঁর পরে সেই টুকরোগুলোকে মুখে নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে একেবারে গুঁড়ো করে ফুঁ দিয়ে এক কুয়াশার সৃষ্টি করে দিলেন। সেই কুয়াশার থেকে তৈরী হল আরও তিন সুন্দরী দেবীর। সুন্দরী মানে একমাত্র আমাতেরাসু ছাড়া বাকী অন্য সবার চেয়ে সুন্দরী।

এইভাবে সুসানো-ও তাঁর বোনের কাছ থেকে পাঁচটা মণি চেয়ে নিয়ে তাঁকে মুখে পুরে চিবিয়ে গুঁড়ো করে ফুঁ দিলেন। আর ঠিক আমাতেরাসুর তৈরি তিন দেবীর মত সুসানো-ওর ফুঁ থেকে তৈরী হল পাঁচ দেবতা। এরা প্রচন্ড শক্তিশালী হলেন তবে সুসানো-ওর মতন নয়।

নিজের কৃতিত্বে সুসানো-ও আত্মহারা হয়ে লাফাতে শুরু করে দিলেন আর বলতে শুরু করলেন যে সবাই দেখুক যে কি ভাবে সুসানো-ও দেবতাদের সৃষ্টি করেছে। আমাতেরাসু একটু রেগেই বললেন, ওগুলো তো আমার দেওয়া মণির থেকে তৈরী হয়েছে। সুসানো-ও রেগে কাই।   অন্য কিছু করা গেলেও হত। কিন্তু রাগের মাথা সুসানো-ও ঝড় বৃষ্টি এনে আমাতেরাসুর সমস্ত ক্ষেতখামার ভাসিয়ে দিল। বানের জলে মন্দির গুলো ভেঙ্গে গেল। আর জঞ্জালে চারদিক ভরে গেল।

 যদিও আমাতেরাসু তাঁর ভাইএর কাছ থেকে এইরকম কিছু হতে পারে বলে ভেবেছিল কিন্তু তাঁর চিন্তায় ছিল না যে সুসানো-ও এত কিছু নষ্ট করে ফেলবে। এটা অবশ্যি তাঁর জানা ছিল যে সুসানো-ও একটা গোঁয়ার গোবিন্দ ছেলে তবুও। মনে মনে তিনি ভাবলেন, যাক এবার সুসানো-ওর রাগ হয়ত একটুঁ কমেছে আর এই সব ঠিক করার কাজে ও একটু হাত লাগাবে।


কিন্তু কোথায় কি, বরঞ্চ সুসানো-ও আরও কি ভাবে আমাতেরাসুর সাথে দুর্ব্যবহার করা যায় তাঁর দিকেই নজর দিতে শুরু করলেন। ওদিকে আমাতেরাসুও  ভাবতে লাগলেন কি সে এত অন্যায় করেছে সে তাঁকে এই রকম একটা গোঁয়ার ভাইএর দুর্ব্যবহার সহ্য করতে হচ্ছে।

একদিন আমাতেরাসু তাঁর নিজের পূজার ঘরে বসে পুজার জন্য কাপড় গোছগাছ করছিলেন ঠিক সেই সময়েই সুসানো-ওর মনে হল যে তাঁর বোনের এই সব কিছু অগ্রাহ্য করে যাওয়া আর তাঁর পছন্দ নয়। এইবার একটা কিছু করার দরকার যাতে হয় আমাতেরাসু তাঁর সাথে লডাইএ নামবে নয়তো হেরে গিয়ে তাঁর অধীনতা স্বীকার করবে। সে একটা ঘোড়াকে আচ্ছা করে চাবকিয়ে সেই আমাতেরাসুর পূজাঘরের ছাদ দিয়ে নীচে ফেলে দিলেন। ঘোড়াটা তো পড়ে মরে গেল, কিন্তু তাঁর জীনে একটা কাগজে কিছু লেখা দেখতে পাওয়া গেল। লেখাটা অবশ্যি সুসানো-ওর আর আমাতেরাসুকে লেখা। তাতে লেখা আছে, পৃথিবীতে সব কিছুই, এই ঘোড়ার গাঁয়ের রঙের মত সাদা কালো আলাদা ছোপে ছোপে নয় তাঁর মধ্যে কিছুটা মেলানো রঙও থাকে

ব্যপারটা আর আমাতেরাসুর সহ্য হল না কারণ ভয়ের চোটে ঐ ঘোড়াটার পড়ে গিয়ে মরে যাওয়ার সময় আমাতেরাসুর এক খুব নিকট বন্ধুও ভয় পেয়ে মারা যান। আমাতেরাসু ঠিক করলেন যে আর নয়, এবার সব কিছু ছেড়ে পালাতে হবে। মানে এক দূর জায়গাতে যেখানে কেউ তাঁকে আর বিরক্ত করতে না পারে।

আমাতেরাসু দৌড় লাগালেন দূর পাহাড়ের দিকে। আর গিয়ে আশ্রয় নিলেন এক গভীর গুহার মধ্যে, সুধু আশ্রয় নেওয়া নয়, একটা পাথর টেনে গুহার মুখটাও বন্ধ করে নিলেন।   তাতে আমাতেরাসুকে গুহার ভেতরের অন্ধকারের মধ্যে থাকতে হল বটে,  কিন্তু গুহার বাইরের অবস্থাটা খুবই খারাপ। বাইরের লোকেদের কাছে আর সেই আমাতেরাসুর জ্যোতির আলো নেই, তাঁরা ঘন মিশকালো অন্ধকারে পরে রইল।

এদিকে দেব আর দেবীদের প্রায় আটশ জনের এক জোট একটা নদীর শুখা বুকে বসে  ঠিক করতে শুরু করলেন  কি ভাবে আমাতেরাসুকে গুহার বাইরে আনা যায়। জ্ঞানী বুড়া দেবতা ধরা হল। তিনি বললেন যেখানে যত রাজ্যের মোরগ আছে, তাদের একসাথে করা হোক। আর আমাতেরাসুর সেই গুহার সামনে একটা গাছে বেশ কিছু আয়না টাঙ্গানো হোক।

এই সময় আর এক দেবী, আমা নো উজুমে এসে এই পরিকল্পনাতে আরও একটু কিছু যোগ করে দিলেন। তিনি তাঁর সাধারণ বেশ ছেড়ে খালি কিছু লতাপাতা দিয়ে তৈরী পোষাক পরে একটা বড় বাল্টীকে উলটো করে তাঁর উপরে নাচতে শুরু করে দিলেন। সে এক উদ্দাম নাচ। ওখানে যত দেবদেবীরা ছিল তারা হেঁসে গড়িয়ে পড়ে আর হাততালি আর সিটির বহর পড়তে থাকে। আর ঐ সব দেবদেবীরা যে সব মশাল জ্বেলে নাচ দেখছিলেন সেই মশালের আলোতে দিন হয়ে গেছে ভেবে মোরগগুলো একসাথে চেঁচাতে শুরু করে দিল।

সে এক বিরাট হই চই ব্যপার। আমাতেরাসু গুহার ভেতর থেকে বাইরের গন্ডগোলের আওয়াজ পাচ্ছিলেন কিন্তু কি ব্যপার বুঝতে পারছিলেন না। তাঁর অবর্তমানে অন্য দেবদেবীরা হাসিঠাট্টা করে সময় কাটাচ্ছেন, এটা তিনি ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। অতএব দেখতে হয় কি ব্যপার হচ্ছে বাইরে।

বাইরেও সবাই এই জিনিষটা হবে বলে ভেবে রেখে শক্তির দেবতাকে গুহার মুখের কাছেই রেখে দিয়েছিলন, যাতে আমতেরাসু বের হলেই তাঁকে টেনে একেবারে বাইরে নিয়ে আসা যায়। কিন্তু তাঁর আর দরকার পড়ল না। আমাতেরাসু গুহার বাইরে তাকিয়ে প্রথমে তাঁর নিজের ছায়াই আয়নাগুলোতে দেখতে পেলেন আর তাঁর পরেই দেখতে পেলেন যে বাইরে তাঁকে পাবার জন্য সমস্ত দেবদেবীরা কি ভাবে অপেক্ষা করছেন।  তাঁর ভয় আর রাগ মিলিয়ে গেল।

আমাতেরাসু তাঁর নিজের প্রাসাসে ফিরে গেলেন। পৃথিবী তাঁর জ্যোতির থেকে বঞ্চিত হল না, ওদিকে সুসানো-ও কেও তিনি তাঁর কাজের জন্য ক্ষমা করলেন।



রবিবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৪

সৃষ্টির আদিম অবস্থা (মিশরীয় মতে) বা “রা”

রা


বহুদিন আগে, যখন চারদিক অন্ধকারে ভরে ছিল তখন ছিল খালি জল। আর সেই জলের মাঝ থেকে উঠে এলেন এক জ্যোতির্ময় ডিম। নাম তার  রা।  তিনি একা, কাজেই তাঁর ক্ষমতা অসীম। আর সেই ক্ষমতা তাঁর নামে মধ্যে ছিল। সেই কারণেই নামটা গোপন করে রাখা ছিল।

মজা হল তিনি এক একটা করে নাম নেন আর সেটার সৃষ্টি হয়। খালি তিনি আর নিজের নাম কোন সময় নেন না কেননা সেটা অন্য কেউ জানলেই তার সমস্ত শক্তি চলে যাবে। এই ভাবে তিনি তার নাম নিলেন ভোর বেলায় খেপেরা বা ঊষা, দুপুরের নাম হল  রা বা সূর্য, আর বিকেলে নাম নিলেন আটুম বা সন্ধ্যা। নাম দেওয়ার সাথেই এদের সৃষ্টি হল।

এর পরে একে একে তৈরী করলেন শু বা বাতাস, তেফনুট বা মেঘ, গেব বা পৃথিবীকে।  তার পরে সৃষ্টি করলেন নূট বা আকাশের দেবীকে। যার হাত রইল এক দিগন্তে, আর অন্য দিগন্তে রইল পা। এই ভাবে নুট পৃথিবীর উপরে নিজেকে জড়িয়ে নিল।তার পরে তৈরী করলেন হাপী, যিনি নীলে নদ হয়ে মিশরের বুকে বইতে সুরু করলেন।

পরে একে একে সব জিনিষ পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি করে দিলেন। তারা বাড়তে লাগল।এবার সময় হল মানব জাতি তৈরী করার। মানব জাতির স্ত্রী আর পুরুষদের তৈরী করে দেবার পরে তাদের মধ্যে এক পুরুষের সৃষ্টি করা হল যিনি হলে ফারাও। এই ফারাওএরা মিশরের বুকে সহস্র বছর ধরে শাসন করছিলেন।  আর রাএর কল্যানে মিশরে কোন কিছুর অভাব রইল না। লোকে পরে কিছু ভাল হলেই বলত যেন রাএর সময়ের মত

কিন্তু সবারই বয়স হয় আর তাঁকে বুড়ো হতে হয়। রাও বুড়ো হল আর তার মিশরের এক দিক থেকে আরেক দিকে যেতে সময় লাগতে লাগল। লোকেরা ঠাট্টা করতে শুরু করল রা বুড়ো হয়েছে,  তার আর পায়ে জোর নেই,  কতক্ষন সময় নিচ্ছে আজকাল। আর দেখেছ তা চুলগুলো কিরকম সাদা ফিনফিনে হয়ে গেছে। রা বোঝে সবই কিন্তু সহ্য করে যায়। কিন্তু সহ্যেরওতো একটা সীমা হয়। 

শেষে একেবারে রেগে গিয়ে রা তার তৈরী শু, গেব, নুট, তেফনুট এদের ডেকে বললেন,  দেখ, আমি তোমাদের সৃষ্টিকর্তা আর তোমাদের অধীনের মানুষের সৃষ্টি করেছি আমিই। কিন্তু তারা আর আমাকে মানছে না।  আমার আইনকানুন সব কিছু তারা অগ্রাহ্য করছে। তার পরে পরমপিতা নু কে বললেন, দেখুন এরা কি ভাবে আমার কোন আইন মানে না, সব কিছুই নিজেদের ইচ্ছা মতন করে বেড়াচ্ছে। এদের জন্য কি উপায় আছে। মনে হয়ে মাঝে মাঝে এদের ধ্বংস করে ফেলি, কিন্তু আপনার আদেশ না পেলে কিছু করব না। বলুন কি করা যায়

নু বললেন, তোঁমার রক্তচক্ষু এদের দিকে ফেল যাতে এরা ভয়ে নিজেদের ঠিক করে নেয়। আর পুত্র আমার, তুমি তোমার কন্যা শেখমেত কে পাঠাও এদের শায়েস্তা করতে।  পরমপিতা নুএর কাছ থেকে আদেশ পাবার পরে সৃষ্টি করলেন তাঁর কন্যা, এক সিংহিনী,  হিংস্র, রক্তপিপাসু, যার নাম হল শেখমেত।  খুঁজে বেড়াতে লাগলেন তাদের, যারা রাএর আইন মানেনি, আর তাদের হত্যা করে তাদের অক্ত পান করে নিজের পিপাসা মেটাতে লাগলেন। কোথাও কারুর নিস্কৃতি নেই। কোন আপীল বা ক্ষমা নেই, একেবার চরম বিচার। নীল নদের জলের রঙ লাল হয়ে গেল মানুষের রক্তে। মিশরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে শেখমেতের হুঙ্কার শোনা যায় আর যারা শোনে তারা প্রানের ভয়ে লুকোতে চায় কোথাও না কোথাও।

এদিকে রা তার পৃথিবীর দিকে তাকান আর দু:খে তার মন ভরে ওঠে কেননা সারা পৃথিবীর বা মিশরের রঙ তখন লাল। ওদিকে শেখমেত যতক্ষন না নিজের থেকে থামছেন ততক্ষন রাএর আদেশ আর মানছেন না। বাধ্য হয়েই রা আদেশ করলেন ঝোড়ো হাওয়ার গতিতে যে দৌড়তে পারে তাঁকে, যাও নীল নদের উপরদিকএর পাহাড়ী জায়গা থেকে আমাকে লার রঙের মাটী এনে দাও

হুকুম তামিল হতে সময় লাগলো না। রা এর শহর হেলিওপোলিসে  সন্ধ্যে নাগাদ সেই লাল মাটী এসে হাজির। আর ততক্ষণ ধরে শহরের মেয়েরা লেগে গেছিল মদ তৈরী করতে। ভাল আঙ্গুর থেকে তৈরী মদ। আর তৈরী করা হল কম নয়, সাত সাত হাজার পিপে ভর্তি। এবার রা করলেন কি ঐ যে লাল মাটী আনা হয়েছিল সেগুলোকে  মদের  সাথে মিলিয়ে দিলেন। দেখতে দেখতে সাত হাজার পিপের মদ দেখে মনে হতে লাগল সাত হাজার পিপে ভর্তি রক্ত।
এবার রা বইল্লেন, যাও এই মদ নিয়ে গিয়ে সেখমেত যে রাস্তায় যাতায়াত করে সেই মাঠে ঢেলে দিয়ে এস। লোকেরা সেই কাজ করল। চাঁদের আলোতে সেই মদ দেখে মনে হতে লাগল মাটীর উপরে এক বিঘত উচু হয়ে মানুষের রক্ত জমে আছে।

সক্কাল বেলায় সেখমেত বেরলেন মানুষ শিকারে। রাস্তায় ঐ লাল রঙের তরল দেখে ভাবলেন মানুষের রক্ত। আগে খেয়ে নিই, শুরু করলেন, প্রথমে অল্প করে তার পরে পেট ভর্তি করে খেয়ে নিলেন। কিছুক্ষনের মধ্যে তার নেশা হয়ে  গেল আর মানুষ মারবার কথা মনেই রইল না।  দিনের শেষে শেখমেত একটাও মানুষ না মারতে পেরে রাএর কাছে ফিরে এলেন। রা তাঁকে শান্ত দেখে আশীর্বাদ করে বললেন আর তার মানুষ মারার দরকার নেই। আজ থেকে তার নাম হল হাথর। তার স্বভাব বদল হয়ে হল শান্ত, মিষ্ট। আজ হেলিওপলিসের মদের রঙ নব বর্ষের দিনের জন্য ঐ লাল মাটী মিলিয়ে লাল করে রাখা হয়।

মানুষের শাস্তি তো শেষ হল কিন্তু রাএর বৃদ্ধ হওয়া তো বন্ধ হল না। আর তার মাথায় বিচারশক্তি ঠিক করে আসে না, একজন নতুন লোকের দরকার। কিন্তু কি ভাবে? রাএর আসল নাম না জানতে পারলে তো কারুর সেই শক্তি আসবে না।

ইতিমধ্যে গেব আর নুটের ছেলে মেয়ে হয়েছে । অসিরিস , আইসিস, সেত আর নেফদীজ। এদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ছিল আইসিস। তার মাথায় সব কিছুর জ্ঞান ছিল, স্রেফ রাএর গোপন নামটা ছাড়া। ঠিক করলেন কোন না কোন ভাবে সেটা  জানতেই হবে।

ওদিকে বুড়ো রাএর হাটতে চলতে কষ্ট হয়, হাত পা কাপে, একদিন এই ভাবে চলবার সময় তার মুখ থেকে মাটীতে থুতু ফেলে দিতে সেটা কাদায় পরিনত হল। আইসিস সেটাকে দেখে তার থেকে একটা সাপ বানিয়ে নিল। নাম হল তার ঊরিয়াস।  

আইসিস এইবার সেই সাপটাকে যে রাস্তায় রা যাতায়াত করে, তার উপরে ফেলে  দিল। যার ফলে সেটা সুযোগ পেয়েই রাকে কামড়ে দিল। বিষ রাএর সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ল। যন্ত্রনাতে রা কাতর। বলে এটা কি কামড়াল যাতে এত কষ্ট পাচ্ছি, আমি তো এটাকে বানাই নি। এর বিষ আমার কাছে অজানা, কি ভাবে এই জ্বালা কমবে তা জানি না। এর কি যে প্রতিকার তা তোমরা দেবতারা যদি জান তবে সেটা কর। আমি আর এটা সহ্য করতে পারছি না।

সমস্ত দেবতারা এসে হাজির। সাথে আইসিসও। এসে জিজ্ঞেস করে, হে রা, আপনাকে কি সাপে কামড়েছে?  রা বলে তিনি তো সাপ তৈরী করেননি, তবে এল কোথা থেকে। এর বিষও তিনি চেনেন না। কিন্তু এর জ্বালা আর সহ্য হচ্ছে না। আইসিস বলেন, আপনি আপনার নামের ক্ষমতা আমার যাদুকে দিন, তবেই সে যাদু  আপনার এই বিষ তাড়িয়ে দেবে। রা একে একে তার অন্য সব নাম বলতে থাকেন। বলেন আমি পর্বতের সৃষ্টিকর্তা, তার পরে বলেন নদনদীর সৃষ্টিকর্তা, আমি আলোক এবং অন্ধকারের সৃষ্টিকর্তা, কিন্তু আসল নাম আর বলেন না।  ওদিকে আইসিস ও বুঝতে পারে যে রা তার আসল নাম বলছেন না। তিনি বলেন যে আপনি কিন্তু যতক্ষণ আপনার আসল নাম না বলবেন ততক্ষন এই বিষ আপনার সারা দেহে ছড়িয়ে যাবে। 
  
অবশেষে রা সেই বিষের জ্বালা সহ্য না করতে পেরে বলে উঠলেন, আগে তাহলে আইসিস প্রতিজ্ঞা করুক যে আর কাউকে এই নাম তিনি বলতে পারবএন না। খালি তার ছেলে হোরাসই এই নাম জানতে পারে। আইসিস সেইরকম প্রতিজ্ঞা করলে রা বলে উঠলেন, আমার গোপন নাম  আমার মন থেকে আইসিসের মনে যাক। আর রাএর গোপন নাম আইসিস জানতে পেরে গেলেন। আইসিসের যাদুতে রাএর বিষ নেমে গেল।

কিন্তু রাএর শাসনের এই সাথে অবসান হল। আর তাঁকে মিশরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে হল না। বদলে তার জায়গা হল আকাশে। সারা দিন তিনি আকাশে থেকে সব দিকে নজর রাখেন পরে রাতের অন্ধকারে তিনি মৃত্যুপূরীর অন্ধকার পার হয়ে আবার সকালে তার নিজের জায়গা আকাশে আসেন। আর মৃত্যুপূরী পার হবার সময় সেই সমস্ত আত্মারা , যারা পৃথিবীতে জ্ঞান বিতরণ করতেন তাদের সাত্থে করে মৃত্যুপূরীর রাস্তার বিপদ পার করিয়ে দিতেন।
এর পরে অসিরিস এবং আইসিস আর তাঁর পরে হোরাস এর শাসন পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হল।

                   

  

বৃহষ্পতিবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৪

অসিরিস আর আইসিসের গল্প

                                   অসিরিস আর আইসিস

বহুদিন আগের কথা।  রা মানে সুর্যদেব যখন বেশ বুড়ো হয়ে পড়েছিলেন তখন শুনলেন যে একবার যদি আকাশের দেবী নুটের ছেলেপিলে হয় তবে কিন্তু তার রাজত্ব খতম। সেই ছেলেরাই রাজপাট সব নিয়ে নেবে। এদিকে নুট আর পৃথিবীর দেবতা গেবের বিয়ে প্রায় ঠিক । কি করা যাবে। অনেক ভেবে ঠিক করলেন যে নূটকে যদি শাপ দিই যে তোর  বাচ্চাকাচ্চা হবে না তবেই ঠিক হয়। অতএব যা ভাবা তাই করে দিলেন। মনের দুঃখে নুট গেলেন থোটের কাছে। কে এই থোট? থোট হলেন রাএর ছেলে, জ্ঞানের দেবতা। তাঁকে একটা উপায় তো বার করতেই হয়।  বুদ্ধি করে থোট গেলেন চাঁদের দেবতা সিলেনের কাছে।

এ কথা সে কথার পরে বললেন, এস আমার সাথে একটু বাজী ধরে খেলা যাক। কি খেলা হবে, না পাশা খেলা। একটার পরে একটা দান খেলা হচ্ছে, আর সিলেনে  হেরে যাচ্ছে।  শেষকালে সিলেনে তার আলো, মানে চাঁদের আলোর কিছু অংশ বাজী ধরে বসল। আর যথা নিয়মে হেরেও গেল। সেই থেকে চাদের আলো সূর্যের আলোর থেকে কমজোর। কিন্তু আর তো বাজী ধরার মত কিছু নেই। অতএব খেলা খতম। থোট তখন তার জেতা আলো গুলো নিয়ে বানালেন পাঁচটা বাড়তি দিন।

আগে বছর হত তিনশ ষাট দিনে । এখন থেকে আরও পাচদিন বেড়ে হল তিনশ পয়ষট্টি দিন। এইবার তো আর রাএর অভিশাপ কাজে আসবে না। সে অভিশাপ ছিল বছরের তিনশ ষাট দিনের উপরে এখন তো তার অভিশাপের বাইরে আরও পাচটা দিন এসে গেছে।

এই পাচদিনের প্রথন দিনে জন্ম নিল অসিরিস, নুটের বড় ছেলে। তার পরের দিনটাকে সরিয়ে রাখা হল হোরাসের জন্মের জন্য, মানে নুটের নাতির জন্মানর জন্যে। তৃতীয় দিনে জন্ম নিলে নুটের দ্বিতীয় ছেলে , কালোকুলটি রঙের সেত।   চতুর্থ দিনে জন্ম নিল আইসিস আর পঞ্চম দিনে নেফদীজ।  মজা হল এই যে সূর্যদেবের অভিশাপকে পাশ কাটিয়ে নুটের সন্তানেরা হল।  আর সেই সময়ের প্রথা অনুযায়ী অসিরিস আর আইসিসের মধ্যে, আর সেত আর নেফদীজের মধ্যে পরে বিয়ে হয়েছিল।

অসিরিস যখন জন্মালেন তখম থেবেসের মন্দির থেকে ভবিষ্যৎবাণী হয়েছিল যে এই ছেলে সমস্ত বিশ্বে শান্তি আর আনন্দের উৎস হবে। আর ওদিকে সেত হলেন অন্ধকারের মৃত্যুপূরীর দেবতা।  আইসিস রাএর আসল নাম জেনে ফেলার পরে সমগ্র বিশ্বের রাজপাট চলে গেল তার এবং অসিরিসের হাতে।

অসিরিসের কাছ থেকে মিশরের লোকেরা শিখল কি করে নীলে নদের বন্যার জল সরে গেলে চাষবাস করতে হয়, কিভাবে কাঁচা মাংস খাবার বদলে রান্না করে খাবার তৈরী করা হয়। তার পরে অসিরিস শেখালেন তাদের আইন, সমাজ, আচরণ। মিশরের লোকে হয়ে উঠল সভ্য। এবার অসিরিসের কাজ হল সারা বিশ্বে তার শিক্ষা কে ছড়িয়ে দেবার। এই সব করার জন্য লোকে অসিরিসের ভক্ত হয়ে পড়েছিল আর সেটাই সেত এর হিংসার কারণ হচ্ছিল। 

ওদিকে অসিরিস যখন বিদেশ থেকে দেশে ফিরে এল তখন সেতই প্রথম তাকে সাদরে বরণ করে নিল। এটা কিন্তু ছিল ছল। সেতএর বাহাত্তর জন সহকারী মিলে ঠিক করে নিয়েছিল যে অসিরিসকে মারতেই হবে। সেত রাগে দুঃখে পাগল, ভাবে কি করে অসিরিসের মৃত্যু হবে। ভেবে চিন্তা করে এক উপায় বার করল।

ঠিক অসিরিসের দেহের মাপ অনুযায়ী একটা সুন্দর কাঠের কারুকার্য করা বাক্স বানান হল। আর তার পরে অসিরিসকে এক ভোজসভার নিমন্ত্রণে ডাকা হল। খাওয়ার পরে সেই বাক্স এনে হাজির করা হলে সেত বলে আমি জানিনা যে এটা কোন সৌভাগ্যবানের মাপের হবে, কিন্তু যারই হক না কেন এটা তারই হবে।  সেতএর লোকেরা একের পর একে হুড়োহুড়ি করে চেষ্টা করতে লাগল। কারুরই ঠিক মাপে হয় না। শেষে কৌতুহলের বশে অসিরিস বলে উঠল, আমি দেখি। এই বলে সে বাক্সটার মধ্যে ঢুকতেই দেখা গেল একেবারে ঠিক মাপের। অসিরিস বলে তাহলে এটা আমার।  সেত বলে নিশ্চয়ই সারা জীবনের জন্য। এই বলে বাক্সটাকে পেরেক মেরে বন্ধ করে দিয়ে সীসের চাদরে মুড়ে নীল নদের জলে ফেলে দিল। নীল নদের দেবী হাপী, সেই বাক্সটাকে নিয়ে গেলেন সমূদ্র পারে ফিনিসিয়ার উপকূলে।

 অসিরিসের মৃত্যু হল, কিন্তু না তা নয়। তার আত্মা বেচে রইল। ওদিকে অসিরিসের দেহ নিয়ে বাক্সটা বিবলসের উপকূলের একটা গাছের গোড়ায় গিয়ে পড়ল, গাছটাও পরম মমতার সাথে সেই বাক্সটাকে তার নিজের ভেতরে লুকিয়ে নিল যাতে সেত তার কোন খবর না পায়।

ইতিমধ্যে ফিনিসিয়ার বিবলসের রাজা সস্ত্রীক একবার ঐ উপকূলে এসে গাছটাকে দেখে খুব মুগ্ধ হন আর বলেন এটাকে কেটে আমার প্রাসাদে নিয়ে এস যাতে এটা দিয়ে আমার প্রাসাদের ছাতের জন্য একটা সুন্দর স্তম্ভ বানান যায়। তাই করা হল। ইতিমধ্যে আইসিস তার শিশু পুত্র হোরাস কে নিয়ে কেঁদে কেঁদে সারা বিশ্ব অসিরিসের জন্য পাখী হয়ে খুঁজে বেড়াতে লাগলেন। তার সেই কান্না সাহারার সিমূম ঝড়ের হাওয়ার আওয়াজের মত হয়ে ঘুরতে লাগল। শেষে সেতের ভয়ে তিনি গিয়ে বুটো দেবীর বাসস্থান এক দ্বীপে আশ্রয় নিলেন, আর তার হাতে হোরাসের দায়ীত্ব সঁপে দিলেন। আরও নিরাপত্তার জন্য সেই দ্বীপটাকে তার মূল থেকে আলাদা করে দিলেন যাতে সেটা সমূদ্রে ভাসতে থাকে আর কেউ তার ঠিকানা জানতে না পারে।
   
 তার পরে শুরু হল অসিরিদের দেহটাকে আরও ভাল করে খোঁজা। অনেক এদিক ওদিক খোঁজার পরে দুটি শিশু আইসিসকে খোজ দিলে যে ঐ রকম একটা বাক্সকে তারা নদীরে জলে ভেসে যেতে দেখেছে। আইসিস গেলেন নদী ধরে সমূদ্রের পারে, সেখানে অনেক খোঁজ করার পরে আবার দুটি শিশু তাকে খবর দিলেন বাক্সটা কোন দিকে গেছে। আইসিস খুসী হয়ে বলে দিলেন যে শিশুরা এর পর থেকে সত্যি কথাই বলবে।

আইসিস অসিরিসের দেহ খুজতে খুজতে গিয়ে বিবলসে হাজির হলেন। এক ঝর্ণার ধারে  বসে ভাবছেন কোথায় খোঁজ পাওয়া যায়, এর মধ্যেই বিবলসের রানীর চাকরাণিরা এক দিন ঐ ঝর্নাতে স্নান করতে এলে আইসিস তাদের চুলে ভাল করে বিনুনী করে সাজিয়ে দিলেন। তারা রাজপ্রাসাদে পৌছালে রাণি তাদের বিনুনী দেখে এবং গায়ে সুগন্ধ পেয়ে সব জিজ্ঞেস করলে তারা সব কথা বলে। রাণিমা গিয়ে আইসিসকে প্রাসাদে নিয়ে আসেন। আর তার ছোট ছেলে ডিক্টিসকে দেখভাল করার কাজ দিয়ে দেন।
ছোট্ট ডিক্টিসকে আইসিসের খুব পছন্দ হয়ে গেছিল। তাই তাকে তিনি অমর করে দিতে চাইছিলেন। সেই হিসাবে রোজ রাত্রে ডিক্টিসের শরীরে আগুন লাগিয়ে তার নশ্বর দেহটাকে একটু একটু করে পুড়িয়ে দিতে লাগছিলেন। কিন্তু রাণীমা একদিন দেখে ফেলায় ঘরে ঢুকে পড়েন আর আইসিসের দেবীচেহারা দেখে ফেলেন। ডিক্টিজকে অমর করার এই কাজ আর সমাপ্ত হয় না। ইতিমধ্যে আইসিস রাণীমার কাছে সেই স্তম্ভটা চান। রাণিমা খুসীমনে সেটা তাঁকে দিয়ে দেন।

স্তম্ভ থেকে অসিরিসের দেহ ভর্তি বাক্সটা বার করে নিয়ে  স্তম্ভটা আইসিস রাণিমাকে ফেরত দিয়ে দিলেন যাতে তার প্রাসাদের ছাতের কোন ক্ষতি না হয়।। আর বাক্সটা নিয়ে আইসিস মিশরের দিকে রওয়ানা দিলেন। নিশরে পৌঁছে দেখেন তার অবর্তমানে তখন সেত রাজত্ব করছে। তাই সেই বাক্সটাকে এক ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রেখে  হোরাসকে আনতে বুটোর কাছে চলে গেলেন। 
ওদিকে সেত একদিন শূয়োর মারার জন্য তার লোকজন দলবল নিয়ে ঐখানেই এসে পড়ল। কুকুরেরা ঝোপের ভেতর থেকে সেই বাক্সটাকে আবিস্কার করলে, সেত রাগে লাল হয়ে উঠল। ক্ষেপে গিয়ে কুড়ুল দিয়ে অসিরিসের শরীরটাকে বিয়াল্লিশ টুকরো করে নীল নদে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হল যাতে নদের কুমিরেরা তার দেহটাকে খেয়ে নেয়। কিন্তু কুমীরেরা কি বুঝে সেটা আর খায়নি। খালি সেহের একটা টুকরো এক মাছে খেয়ে নিয়েছিল। সেই থেকে মিশরের লোকেরা সেই মাছটা আর খায় না।

আইসিস আবায় কষ্ট করে অসিরিসের দেহের টুকরোগুলো জোগাড় করে তাকে কাপড় জড়িয়ে আসল চেহারার মত করে লুকিয়ে রেখে দিল।যদিও দেহের সমস্ত টুকরো গুলো পাওয়া যায় নি তবুও আইসিস তার যাদু ক্ষমাতার বলে সেটাও তৈরী করে নিলেন।এদিকে সেত গর্ব করে বলে বেড়াতে লাগল যে ভগবানের মৃত্যু হয় না, কিন্তু আমি অসিরিস ভগবানের দেহটাকে টুকরো টুকরো করে তাঁকে মেরেছি। কিন্তু এবার তার স্ত্রী নেফদীজ আর সেতের সংগ দিল না, সে চলে গেল অসিরিসের দলে। এবং আইসিসের খোঁজার ব্যপারে আইসিসকে সাহায্য করতে লেগেছিল। আর অসিরিসের দেহটা আবার জোড়া দিয়ে তৈরী করার পরে তার আত্মা চলে গেল মৃতদের রাজত্বে। অপেক্ষা রইল সেই দিনের যে দিন হোরাস আর সেতের লড়াইএ হোরাসের জয় হবে।

হোরাস বড় হয় আর তাঁকে অসিরিসের আত্মা এসে নানান ভাবে জ্ঞান দ্যায়। একবার এই রকম জিজ্ঞেস করা হল যে পৃথিবীতে সবচেয়ে মহান কাজ কি। হোরাসের উত্তর ছিল যে বাপ-মার প্রতি অন্যায়ের বিরুদ্ধ লড়ে তার প্রতিকার করা। আবার জিজ্ঞাসা করা হল যে তাতে সবচেয়ে কোন জন্তুর দরকার পড়তে পারে, হোরাসের উত্তর ছিল ঘোড়ার, কিন্তু কেন সিংহ নয় প্রশ্ন করা হলে হোরাস বলে যে সিংহ তো সাহায্যের দরকার হলে কাজে আসবে, কিন্তু ঘোড়া শত্রুকে ধাওয়া করে তাকে ধরতে কাজে লাগবে।  অসিরিস বুঝলেন সময় হয়েছে সেতের বিরুদ্ধে হোরাসের লড়াইতে যাবার।

লড়াই শুরু হল। সেত এক বিশাল বুনো শূয়োরের চেহারা ধরে এসে হোরাসকে আক্রমন করল, কেননা অসিরিস আর রাএর দেওয়া জ্ঞানের মধ্য এই ব্যপারে হোরাসকে কিছু বলা ছিল না। হোরাস তার চোখে আঘাত পেয়ে যন্ত্রণাতে কাতর হলে সূর্যদেব রা তার আলো কমিয়ে অন্ধকার করে দেন আর হরাসের যন্ত্রনা উপশম হয়। কিন্তু ততক্ষনে সেত যুদ্ধ ছেড়ে পালিয়েছে।

এই রকম ভাবে দফায় দফায় যুদ্ধ হতে থাকে কিন্তু কেউই শেষ পর্যন্ত জেতে না। অসিরিস তার দিনের অপেক্ষায় থাকে যেদিন সেত একেবারেই পরাজিত হবে আর সে আবার গিয়ে মিশরের লোকেদের সুখ শান্তির বৃদ্ধি করবে।

আমরাও সেই দিনের অপেক্ষায় থাকি যে দিন ন্যায় আন্যায়ের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে অন্যায়কে পৃথিবীর বুক থেকে একেবার সরিয়ে দিতে পারবে।  

বুধবার, ২৩ জুলাই, ২০১৪

আটলান্টা।

আটলান্টা।

আটলান্টা, আমেরিকার এক শহর,যেখানে কিছুদিন আগেই অলিম্পিকের খেলকুদ হয়ে গেছে। কিন্তু আটলান্টা নামটা জড়িয়ে আছে এক বিখ্যাত দৌড়বিদ মহিলার নামের সাথে। এনাকে অবশ্যি মানবী শরীরে দেখা যায় নি। ইনি ছিলেন গ্রীক পুরানের এক চরিত্র। চরিত্র এই জন্য বললাম যে এনাকে কিন্তু অমর বা দেবদেবীদের পর্যায়ে ফেলা হয় নি। ইনি ছিলেন রাজা আয়াসাসের মেয়ে। মার নাম ক্লিমেনী।

আজকের ভারতীয় সমাজের মত মেয়ে হিসাবে জন্মেছিলেন বলে তার বাবা তাঁকে কাছে চাননি। জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসতে হুকুম করেছিলেন। সেই অনুযায়ী তাঁকে ফেলে দিয়ে আসা হল জঙ্গলে। কিন্তু ঠান্ডা লেগে মরে যাবার আগেই এক মা-ভল্লুক তাঁকে নিজের বাচ্চার মত পালতে লাগল।  আমরা বেশ কিছুদিন আগে ওড়িষাতে  এক নেকড়ে মানুষের কথা কাগজে পড়েছিলাম, তার মতন ব্যপারটা। এই ভল্লুকীটাকে পাঠিয়েছিলেন আর্টেমিস, আটলান্টাকে বাচিয়ে রাখবার জন্য। ঐ ভাল্লুক মার কাছে আটলান্টা বড় হল আর শিকারীর দলে মিশে গেল। আসলে যদিও আটলান্টা ভাল্লুকের কাছে বড় হয়েছিল তবুও জঙ্গলে থাকার সময় সে শিকার করতে শিখে গেছিল।

ইতিমধ্যে ক্যালিডনের রাজা ইনিয়াস একবার তার বাৎসরিক ফসল তোলার পুজোতে আর্টেমিসকে পুজা দিতে ভুলে যান। বাস আর্টেমিসের মেজাজ গরম। শাস্তি হিসাবে পাঠালেন এক বিশালকায় শূকরকে । সে এসে ক্যালিডনের ক্ষেত খামার, মানুষের সম্পত্তি নষ্ট করতে শুরু করে দিল। লোকে ভয়ে ঘরের বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিল। শহরের বাজারে ফসলের কম পড়তে শুরু হয়ে গেল। ইনিয়াস ডেকে পাঠালেন দেশের সমস্ত শিকারীদের যাতে তারা এসে শূকরটাকে মারতে পারে। যে মারতে পারবে তাকে প্রাইজ হিসাবে শূকরটার মাথা আর চামড়াটা দেওয়া হবে।

মারার জন্য যে সমস্ত শিকারী এসে হাজির হলেন তার মধ্যে ছিল এই আটলান্টা আর ইনিয়াসের ছেলে মেলিয়াজর। কিন্তু আটলান্টাকে মেয়ে দেখে কিফফেস আর আঙ্কিয়স নামের দুজন শিকারী তার সাথে শিকারে যেতে রাজী হল না। বাধ্য হয়ে মেলিয়াজর তাদের কোনরকমে রাজী করাল।

আবার শিকারের সময় দুজন থেসালীর অর্ধ মানব, হাইলিয়াস আর রিকাস, আটলান্টাকে মেয়েছেলে দেখে অত্যাচার করার ইচ্ছে নিয়ে জোর করতে গেলে আটলান্টা তার তীর চালিয়ে দুজনকেই মেরে ফেলেন। শিকার, শূকরের রক্তের বদলে ঐ অর্ধ মানবদের রক্ত দিয়ে সুত্রপাত হল। শেষ পর্যন্ত সেই শূকরটাকে প্রথম তীর মারতে পারল আটলান্টাই। মেলিয়াজর এসে সেটাকে তলোয়ারের আঘাতে শেষ করে দিল।

আটলাণ্টাকে দেখে মেলিয়াজরের মনে একটু ভালবাসা আর শ্রদ্ধার উদয় হয়েছিল তাই প্রথম আঘাত করার অজুহাতে প্রাইজ যেটা দেওয়া হবে বলা হয়েছিল সেটা আটলান্টাকেই দেবার জন্য বলে দিল। কিন্তু থেশটিয়সের ছেলেরা আটলান্টার কাছ থেকে সেই প্রাইজ ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করলে মেলিয়াজর তাদের মেরে ফেলেন আর আবার সেই প্রাইজ আটলান্টাকে দিয়ে দেন।

এরা সম্পর্কে মেলিয়াজরের মামা ছিলেন। আগেই ভবিষ্যতবাণী হয়েছিল যে  কুন্ডের কাঠ পুরে ছাই হলেই মেলিয়াজর মারা যাবে। সেই জন্য মেলিয়াজরের মা অ্যালথিয়া কুন্ড থেকে আধপোড়া কাঠটাকে নিয়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন।ভাইদের মৃত্যু দেখে অ্যালথিয়া রেগে গিয়ে সেই কুন্ডের কাঠটাকে বার করে আগুনে ছুড়ে ফেলে দেন।   যা হবার তাই হল, মেলিয়াজরের মার ছোঁড়া কাঠটা পুরে ছাই হয়ে গেল আর মেলিয়াজর মারা গেল।

এইবার আটলান্টা বীর হিসাবে সব জায়গাতে দ্বীকৃতি পাওয়াতে তার বাবাও তাঁকে নিজের বলে স্বীকার করে নিলেন। আটলান্টা তার বাবার কাছে এলেন। এখন তিনি রাজপুত্রী, সাধারণ শিকারী নন। তার বাবা তাঁকে বিয়ে  করানোর ইচ্ছে করলে আটলান্টা এবার আর না করল না। কিন্তু তার মনে তো বিয়ের কোন ইচ্ছেই ছিল না। সোজাসুজি না বললে বাবা তাঁকে শাস্তি দিতে পারে তাই সে এক শর্ত রাখল।

তাঁকে যে দৌড়ে হারাতে পারবে সেই তাঁকে বিয়ে করতে পারবে। কিন্তু যদি আটলান্টা জিতে যায় তবে পরাজিতের তাদের প্রাণ  হারাবে,কারণ আটলান্টাকে দৌড়ে তো কেউ হারাতে পারবে না তাই তার বিয়েও হবে না। লোকে আসে আর হেরে গিয়ে প্রাণ দ্যায়। 

এদিকে আর্কাডিয়ার মেলানিওন আটলান্টাকে খুব ভালবেসেছিল। সে তাঁকে বিয়ে করবার মন করলে এক চিন্তা তো তাঁকে পেয়ে বসে। কি করে দৌড়ে আটলান্টাকে হারান যেতে পারে। সে ধরে পরল আফ্রাদাইতিকে। প্রেমের দেবী আফ্রাদাইতী, তাঁকে এক প্ল্যান দিলেন আর তিনটে সুন্দর সোনার আপেল দিলেন। কিন্তু সাথে বলে দিলেন যে জিতে আটলান্টাকে পেলে পরে দুজনে মিলে তার পূজা দিতে হবে। মেলানিয়ন রাজী।

এবার মেলানিয়ন এসে আটলান্টাকে বলল আমি রাজী তোমার সাথে দৌড় প্রতিযোগীতাতে, আটলান্টা বলে, তুমি জান যে হেরে গেলে তোমার প্রাণ যাবে। মেলানিয়ন বলে আগে হারি তো। দৌড় শুরু হল। বেশ কিছুদূর যাবার পরে যেমনি আটলান্টা আগে এগোচ্ছে অমনি মেলানিয়ন তার হাত থেকে একটা আপেল সামনের দিকে রাস্তায় গড়িয়ে দিল। আটলান্টা দাঁড়িয়ে ওটা তুলে নিয়ে দেখতে দেখতে মেলানিয়ন আবার এগিয়ে গেল।
আটলান্টা আপেলটাকে ফেলে দিয়ে আবার দৌড় শুরু করল। আবার যখন প্রায় কাছাকাছি এসে গেছে তখন মেলানিয়ন তার দ্বিতীয় আপেলটাকে রাস্তার পাশের দিকে এমন ভাবে ছুড়ে দিল যে সেটা তুলতে গেল একটু রাস্তার বাইরের দিকে নামতে হবে। তাই হল আটলান্টা তোর কৌতূহল মেটাতে রাস্তা ছেড়ে গিয়ে আপেলটা তুলে নিয়ে দেখতে শুরু করল, ইতিমধ্যে মেলানিয়ন আবার অনেকটা এগিয়ে গেল।

আটলান্টা আবার দৌড় সুরু করল, এইবার আবার মেলানিয়ন তার শেষ আপেলটাকে রাস্তায় গড়িয়ে দিতে, আটলান্টার পক্ষে লোভ সামলান সম্ভব হল না। সে থেমে ওটাকে তুলে দেখে আবার দৌড় শুরু করে সীমানাতে পৌঁছানোর আগেই মেলানিয়ন সীমারেখা পার করে গেছে। আটলান্টাকে হারতে হল।

বেশি ধুমধামের সাথে দুজনের বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু তারা এতই আনন্দে মশগুল যে আফ্রাদাইতীকে যে পূজা দেবার কথা দেওয়া আছে তার ব্যপারে একদম ভুলে মেরে দিল। আফ্রাদাইতীর রাগ। সে রেগে গিয়ে দুজনকেই সিংহ বানিয়ে দিল।


এখানে একটা কথা । আটলান্টা তো সিংহ হয়ে গেল কিন্তু তার একটা ছেলে হয়েছিল নাম পার্থেনপাস। সেও পরে বড় হয়ে বিরাট বীর হয়েছিল। 

    

সোমবার, ২১ জুলাই, ২০১৪

সিসিফাস


রাজা সিসিফাস। গ্রীক পুরানের এক শয়তানী বুদ্ধি ওয়ালা রাজা। থেসালীর রাজা ইয়োলাসের ছেলে। সালমোনাসের ভাই, এমনিতে রাজা মশাই জ্ঞানী গুণী, ব্যবসা আর নৌচালনা সম্বন্ধে বিশেষ জ্ঞান রাখতেন। তার রাজ্য এই দুটো ব্যপারে বেশ উন্নত ছিল। কিন্তু  ভীষন লোভী আর ঠকবাজ ছিলেন। অবশ্যি ব্যবসাতে উন্নতি করতে গেলে সাধারণত এ দুটোর খুব দরকার পড়ে। আর আতিথ্য জিনিষটা কি তা জানতেন না বরং তার কাছে অতিথিদের অনেককেই মরতে হয়েছে।  একজন কঠোর রাজা হিসাবে সিসিফাসের বেশ নামডাক ছিল। এদিকে তার ভাই এর সাথেও বিশেষ বনিবনা না থাকায় কি ভাবে ভাই সালমোনাসকে মেরে ফেলা যায় তার প্ল্যান কষতে ডেলফির জ্যোতিষীদের কাছে মতামত নিতে গেছিলেন।
নদীর দেবতা আসপসের মেয়ে আইজিনাকে জুস কোথায় নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন সেটাও তার বাবার কাছে জানিয়ে দিতে ভোলেন নি। তার ফল হল করিন্থের  সভাঘরের মাঝ দিয়ে এক ফোয়ারা উঠে সভাঘরটাকে নষ্ট করে দিল।
মানে তার কীর্তিকলাপে সবাই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। জুসের শাস্তি আসবেই। জুস বলে দিলেন থানেটসকে যে চিত্রগুপ্ত হিসাবে কাজ করছিল তাঁকে যে যাও গিয়ে সিসিফাসকে ধরে বেঁধে নিয়ে এস।
সিসিফাস দেখে থানেটস এসে হাজির। ভাবল সাধারণত সংবাদ বাহক  বা পিয়ন হিসাবে তো হারমিস কাজ করে , সে কেন আসে নি। কূটবুদ্ধি তার মাথায় গজগজ করছে। থানেটসকে ভাল মানুষের মত জিজ্ঞেস করে বসল তার চেনটা দিয়ে কি ভাবে কাউকে বাধা হয়। থানেটস ভাল মানুষের মত যেই দেখাতে গেছে অমনি সিসিফাস তাকে ঐ চেন দিয়ে বেঁধে রাখল। চারদিকে হাহাকার, থানেটস পৃথিবীতে আটকা পরে আছে, যতক্ষন না সে যমপূরীতে ফিরে যাবে ততক্ষণ কোন লোক মারা যাবে না। কিন্তু লোক তো জন্মাবে। অর্থাৎ কিছুক্ষণের মধ্যে পৃথিবীতে লোকের ভীড় লেগে যাবে। যুদ্ধের দেবতা শেষ পর্যন্ত তার শত্রুপক্ষের লোকে মরছে না দেখে ক্ষেপে গিয়ে সিসিফাসকেই আটকে রেখে দিলেন। থানেটস মুক্তি পেল। আর সিসিফাসকে নিয়ে যমপূরীর দিকে রওয়ানা দিল।
কিন্তু সিসিফাসের বুদ্ধি কি তাতেই হার মানে।
থানেটস তাঁকে নিয়ে যাবার আগে সে তার স্ত্রীকে বলে দিল যে তার সমস্ত জামাকাপড় খুলে নিয়ে রাস্তার চৌমাথায় দেহটাকে মরে যাবার পরে ছুড়ে ফেলে দিতে। সিসিফাসের স্ত্রীর মাথায় কারণটা ঠিক ঢোকে নি কাজেই সে তাই করল। এইবার সিসিফাসের প্রেতাত্মা ষ্টীক্স নদীর পাড়ে গিয়ে দাড়িয়ে আছে, আগে যাবার হুকুম নেই। যমের জিজ্ঞাসাতে সিসিফাস বলল যে তার অন্তিম সংস্কার এখনো হয়নি। তার স্ত্রী কেন জানিনা কাজ করে নি, কাজেই সে চায় পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে স্ত্রীকে দিয়ে অন্তিম সংস্কার করিয়ে তার পর ফিরে আসবে।  বাধ্য হয়েই পেরসেফণি (যমরাজা) তাঁকে আবার ফেরত গিয়ে তার স্ত্রীকে দিয়ে অন্তিম সৎকার করিয়ে আসতে বলল। আর তাঁকে ফেরত পাঠিয়ে দিল। সিসিফাস খুসী মনে ফিরে এল। তার স্ত্রীকে এল্টু লোকদেখান বকুনী লাগাল। বাস অতটাই। তাঁকে যে অন্তিম সৎকার করিয়ে ফিরে যেতে হবে তার আর হুঁশ নেই।
বাধ্য হয়েই যমরাজ তাঁকে জোর করেই যমপূরীতেই টেনে আনলেন। আর শাস্তি বললেন, তোমার যখন পৃথিবীতে থাকার এতটা সখ তুমি যাও, তোমায় কিন্তু একটা কাজ আগে করতে হবে । ঐ বড় পাথরটাকে গড়িয়ে নিয়ে পাহাড়ের ওপারে ঠেলে ফেলতে হবে। আর ওপারে চলে গেলেই তুমি নর্মাল। কিন্তু পাথরটাকে ওপারে নিয়ে যেতে না পারলে তোমার কাজ শেষ হবে না।
সিসিফাস লাফাতে লাফাতে চলে গেল পাথরটাকে গড়িয়ে পাহাড় ডিঙ্গিয়ে ওপারে নিয়ে যেতে। কিন্তু জুসের সাথে চালাকী? জুস ঐ পাথরটাকে মন্ত্র বলে এমন করে দিলেন যে যখনি পাথরটা পাহাড়ের চূড়াতে পৌছায় তখনই সেটা আবার সিসিফাসের হাত ফস্কে নিচে গড়িয়ে আসে। সিসিফাসকে আবার নীচে এসে ওটাকে উপরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করতে হয়।
এখনো কিন্তু সিসিফাস ঐ কাজটা করে যাচ্ছে। আর মনে হয় কোন দিনই কাজটা শেষ হবে না।  চালাকী দ্বারা মহৎ কাজ হয় না।