রবিবার, ১৭ আগস্ট, ২০১৪

সৃষ্টির আদিম অবস্থা (মিশরীয় মতে) বা “রা”

রা


বহুদিন আগে, যখন চারদিক অন্ধকারে ভরে ছিল তখন ছিল খালি জল। আর সেই জলের মাঝ থেকে উঠে এলেন এক জ্যোতির্ময় ডিম। নাম তার  রা।  তিনি একা, কাজেই তাঁর ক্ষমতা অসীম। আর সেই ক্ষমতা তাঁর নামে মধ্যে ছিল। সেই কারণেই নামটা গোপন করে রাখা ছিল।

মজা হল তিনি এক একটা করে নাম নেন আর সেটার সৃষ্টি হয়। খালি তিনি আর নিজের নাম কোন সময় নেন না কেননা সেটা অন্য কেউ জানলেই তার সমস্ত শক্তি চলে যাবে। এই ভাবে তিনি তার নাম নিলেন ভোর বেলায় খেপেরা বা ঊষা, দুপুরের নাম হল  রা বা সূর্য, আর বিকেলে নাম নিলেন আটুম বা সন্ধ্যা। নাম দেওয়ার সাথেই এদের সৃষ্টি হল।

এর পরে একে একে তৈরী করলেন শু বা বাতাস, তেফনুট বা মেঘ, গেব বা পৃথিবীকে।  তার পরে সৃষ্টি করলেন নূট বা আকাশের দেবীকে। যার হাত রইল এক দিগন্তে, আর অন্য দিগন্তে রইল পা। এই ভাবে নুট পৃথিবীর উপরে নিজেকে জড়িয়ে নিল।তার পরে তৈরী করলেন হাপী, যিনি নীলে নদ হয়ে মিশরের বুকে বইতে সুরু করলেন।

পরে একে একে সব জিনিষ পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি করে দিলেন। তারা বাড়তে লাগল।এবার সময় হল মানব জাতি তৈরী করার। মানব জাতির স্ত্রী আর পুরুষদের তৈরী করে দেবার পরে তাদের মধ্যে এক পুরুষের সৃষ্টি করা হল যিনি হলে ফারাও। এই ফারাওএরা মিশরের বুকে সহস্র বছর ধরে শাসন করছিলেন।  আর রাএর কল্যানে মিশরে কোন কিছুর অভাব রইল না। লোকে পরে কিছু ভাল হলেই বলত যেন রাএর সময়ের মত

কিন্তু সবারই বয়স হয় আর তাঁকে বুড়ো হতে হয়। রাও বুড়ো হল আর তার মিশরের এক দিক থেকে আরেক দিকে যেতে সময় লাগতে লাগল। লোকেরা ঠাট্টা করতে শুরু করল রা বুড়ো হয়েছে,  তার আর পায়ে জোর নেই,  কতক্ষন সময় নিচ্ছে আজকাল। আর দেখেছ তা চুলগুলো কিরকম সাদা ফিনফিনে হয়ে গেছে। রা বোঝে সবই কিন্তু সহ্য করে যায়। কিন্তু সহ্যেরওতো একটা সীমা হয়। 

শেষে একেবারে রেগে গিয়ে রা তার তৈরী শু, গেব, নুট, তেফনুট এদের ডেকে বললেন,  দেখ, আমি তোমাদের সৃষ্টিকর্তা আর তোমাদের অধীনের মানুষের সৃষ্টি করেছি আমিই। কিন্তু তারা আর আমাকে মানছে না।  আমার আইনকানুন সব কিছু তারা অগ্রাহ্য করছে। তার পরে পরমপিতা নু কে বললেন, দেখুন এরা কি ভাবে আমার কোন আইন মানে না, সব কিছুই নিজেদের ইচ্ছা মতন করে বেড়াচ্ছে। এদের জন্য কি উপায় আছে। মনে হয়ে মাঝে মাঝে এদের ধ্বংস করে ফেলি, কিন্তু আপনার আদেশ না পেলে কিছু করব না। বলুন কি করা যায়

নু বললেন, তোঁমার রক্তচক্ষু এদের দিকে ফেল যাতে এরা ভয়ে নিজেদের ঠিক করে নেয়। আর পুত্র আমার, তুমি তোমার কন্যা শেখমেত কে পাঠাও এদের শায়েস্তা করতে।  পরমপিতা নুএর কাছ থেকে আদেশ পাবার পরে সৃষ্টি করলেন তাঁর কন্যা, এক সিংহিনী,  হিংস্র, রক্তপিপাসু, যার নাম হল শেখমেত।  খুঁজে বেড়াতে লাগলেন তাদের, যারা রাএর আইন মানেনি, আর তাদের হত্যা করে তাদের অক্ত পান করে নিজের পিপাসা মেটাতে লাগলেন। কোথাও কারুর নিস্কৃতি নেই। কোন আপীল বা ক্ষমা নেই, একেবার চরম বিচার। নীল নদের জলের রঙ লাল হয়ে গেল মানুষের রক্তে। মিশরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে শেখমেতের হুঙ্কার শোনা যায় আর যারা শোনে তারা প্রানের ভয়ে লুকোতে চায় কোথাও না কোথাও।

এদিকে রা তার পৃথিবীর দিকে তাকান আর দু:খে তার মন ভরে ওঠে কেননা সারা পৃথিবীর বা মিশরের রঙ তখন লাল। ওদিকে শেখমেত যতক্ষন না নিজের থেকে থামছেন ততক্ষন রাএর আদেশ আর মানছেন না। বাধ্য হয়েই রা আদেশ করলেন ঝোড়ো হাওয়ার গতিতে যে দৌড়তে পারে তাঁকে, যাও নীল নদের উপরদিকএর পাহাড়ী জায়গা থেকে আমাকে লার রঙের মাটী এনে দাও

হুকুম তামিল হতে সময় লাগলো না। রা এর শহর হেলিওপোলিসে  সন্ধ্যে নাগাদ সেই লাল মাটী এসে হাজির। আর ততক্ষণ ধরে শহরের মেয়েরা লেগে গেছিল মদ তৈরী করতে। ভাল আঙ্গুর থেকে তৈরী মদ। আর তৈরী করা হল কম নয়, সাত সাত হাজার পিপে ভর্তি। এবার রা করলেন কি ঐ যে লাল মাটী আনা হয়েছিল সেগুলোকে  মদের  সাথে মিলিয়ে দিলেন। দেখতে দেখতে সাত হাজার পিপের মদ দেখে মনে হতে লাগল সাত হাজার পিপে ভর্তি রক্ত।
এবার রা বইল্লেন, যাও এই মদ নিয়ে গিয়ে সেখমেত যে রাস্তায় যাতায়াত করে সেই মাঠে ঢেলে দিয়ে এস। লোকেরা সেই কাজ করল। চাঁদের আলোতে সেই মদ দেখে মনে হতে লাগল মাটীর উপরে এক বিঘত উচু হয়ে মানুষের রক্ত জমে আছে।

সক্কাল বেলায় সেখমেত বেরলেন মানুষ শিকারে। রাস্তায় ঐ লাল রঙের তরল দেখে ভাবলেন মানুষের রক্ত। আগে খেয়ে নিই, শুরু করলেন, প্রথমে অল্প করে তার পরে পেট ভর্তি করে খেয়ে নিলেন। কিছুক্ষনের মধ্যে তার নেশা হয়ে  গেল আর মানুষ মারবার কথা মনেই রইল না।  দিনের শেষে শেখমেত একটাও মানুষ না মারতে পেরে রাএর কাছে ফিরে এলেন। রা তাঁকে শান্ত দেখে আশীর্বাদ করে বললেন আর তার মানুষ মারার দরকার নেই। আজ থেকে তার নাম হল হাথর। তার স্বভাব বদল হয়ে হল শান্ত, মিষ্ট। আজ হেলিওপলিসের মদের রঙ নব বর্ষের দিনের জন্য ঐ লাল মাটী মিলিয়ে লাল করে রাখা হয়।

মানুষের শাস্তি তো শেষ হল কিন্তু রাএর বৃদ্ধ হওয়া তো বন্ধ হল না। আর তার মাথায় বিচারশক্তি ঠিক করে আসে না, একজন নতুন লোকের দরকার। কিন্তু কি ভাবে? রাএর আসল নাম না জানতে পারলে তো কারুর সেই শক্তি আসবে না।

ইতিমধ্যে গেব আর নুটের ছেলে মেয়ে হয়েছে । অসিরিস , আইসিস, সেত আর নেফদীজ। এদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ছিল আইসিস। তার মাথায় সব কিছুর জ্ঞান ছিল, স্রেফ রাএর গোপন নামটা ছাড়া। ঠিক করলেন কোন না কোন ভাবে সেটা  জানতেই হবে।

ওদিকে বুড়ো রাএর হাটতে চলতে কষ্ট হয়, হাত পা কাপে, একদিন এই ভাবে চলবার সময় তার মুখ থেকে মাটীতে থুতু ফেলে দিতে সেটা কাদায় পরিনত হল। আইসিস সেটাকে দেখে তার থেকে একটা সাপ বানিয়ে নিল। নাম হল তার ঊরিয়াস।  

আইসিস এইবার সেই সাপটাকে যে রাস্তায় রা যাতায়াত করে, তার উপরে ফেলে  দিল। যার ফলে সেটা সুযোগ পেয়েই রাকে কামড়ে দিল। বিষ রাএর সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ল। যন্ত্রনাতে রা কাতর। বলে এটা কি কামড়াল যাতে এত কষ্ট পাচ্ছি, আমি তো এটাকে বানাই নি। এর বিষ আমার কাছে অজানা, কি ভাবে এই জ্বালা কমবে তা জানি না। এর কি যে প্রতিকার তা তোমরা দেবতারা যদি জান তবে সেটা কর। আমি আর এটা সহ্য করতে পারছি না।

সমস্ত দেবতারা এসে হাজির। সাথে আইসিসও। এসে জিজ্ঞেস করে, হে রা, আপনাকে কি সাপে কামড়েছে?  রা বলে তিনি তো সাপ তৈরী করেননি, তবে এল কোথা থেকে। এর বিষও তিনি চেনেন না। কিন্তু এর জ্বালা আর সহ্য হচ্ছে না। আইসিস বলেন, আপনি আপনার নামের ক্ষমতা আমার যাদুকে দিন, তবেই সে যাদু  আপনার এই বিষ তাড়িয়ে দেবে। রা একে একে তার অন্য সব নাম বলতে থাকেন। বলেন আমি পর্বতের সৃষ্টিকর্তা, তার পরে বলেন নদনদীর সৃষ্টিকর্তা, আমি আলোক এবং অন্ধকারের সৃষ্টিকর্তা, কিন্তু আসল নাম আর বলেন না।  ওদিকে আইসিস ও বুঝতে পারে যে রা তার আসল নাম বলছেন না। তিনি বলেন যে আপনি কিন্তু যতক্ষণ আপনার আসল নাম না বলবেন ততক্ষন এই বিষ আপনার সারা দেহে ছড়িয়ে যাবে। 
  
অবশেষে রা সেই বিষের জ্বালা সহ্য না করতে পেরে বলে উঠলেন, আগে তাহলে আইসিস প্রতিজ্ঞা করুক যে আর কাউকে এই নাম তিনি বলতে পারবএন না। খালি তার ছেলে হোরাসই এই নাম জানতে পারে। আইসিস সেইরকম প্রতিজ্ঞা করলে রা বলে উঠলেন, আমার গোপন নাম  আমার মন থেকে আইসিসের মনে যাক। আর রাএর গোপন নাম আইসিস জানতে পেরে গেলেন। আইসিসের যাদুতে রাএর বিষ নেমে গেল।

কিন্তু রাএর শাসনের এই সাথে অবসান হল। আর তাঁকে মিশরের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে হল না। বদলে তার জায়গা হল আকাশে। সারা দিন তিনি আকাশে থেকে সব দিকে নজর রাখেন পরে রাতের অন্ধকারে তিনি মৃত্যুপূরীর অন্ধকার পার হয়ে আবার সকালে তার নিজের জায়গা আকাশে আসেন। আর মৃত্যুপূরী পার হবার সময় সেই সমস্ত আত্মারা , যারা পৃথিবীতে জ্ঞান বিতরণ করতেন তাদের সাত্থে করে মৃত্যুপূরীর রাস্তার বিপদ পার করিয়ে দিতেন।
এর পরে অসিরিস এবং আইসিস আর তাঁর পরে হোরাস এর শাসন পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত হল।

                   

  

বৃহষ্পতিবার, ১৪ আগস্ট, ২০১৪

অসিরিস আর আইসিসের গল্প

                                   অসিরিস আর আইসিস

বহুদিন আগের কথা।  রা মানে সুর্যদেব যখন বেশ বুড়ো হয়ে পড়েছিলেন তখন শুনলেন যে একবার যদি আকাশের দেবী নুটের ছেলেপিলে হয় তবে কিন্তু তার রাজত্ব খতম। সেই ছেলেরাই রাজপাট সব নিয়ে নেবে। এদিকে নুট আর পৃথিবীর দেবতা গেবের বিয়ে প্রায় ঠিক । কি করা যাবে। অনেক ভেবে ঠিক করলেন যে নূটকে যদি শাপ দিই যে তোর  বাচ্চাকাচ্চা হবে না তবেই ঠিক হয়। অতএব যা ভাবা তাই করে দিলেন। মনের দুঃখে নুট গেলেন থোটের কাছে। কে এই থোট? থোট হলেন রাএর ছেলে, জ্ঞানের দেবতা। তাঁকে একটা উপায় তো বার করতেই হয়।  বুদ্ধি করে থোট গেলেন চাঁদের দেবতা সিলেনের কাছে।

এ কথা সে কথার পরে বললেন, এস আমার সাথে একটু বাজী ধরে খেলা যাক। কি খেলা হবে, না পাশা খেলা। একটার পরে একটা দান খেলা হচ্ছে, আর সিলেনে  হেরে যাচ্ছে।  শেষকালে সিলেনে তার আলো, মানে চাঁদের আলোর কিছু অংশ বাজী ধরে বসল। আর যথা নিয়মে হেরেও গেল। সেই থেকে চাদের আলো সূর্যের আলোর থেকে কমজোর। কিন্তু আর তো বাজী ধরার মত কিছু নেই। অতএব খেলা খতম। থোট তখন তার জেতা আলো গুলো নিয়ে বানালেন পাঁচটা বাড়তি দিন।

আগে বছর হত তিনশ ষাট দিনে । এখন থেকে আরও পাচদিন বেড়ে হল তিনশ পয়ষট্টি দিন। এইবার তো আর রাএর অভিশাপ কাজে আসবে না। সে অভিশাপ ছিল বছরের তিনশ ষাট দিনের উপরে এখন তো তার অভিশাপের বাইরে আরও পাচটা দিন এসে গেছে।

এই পাচদিনের প্রথন দিনে জন্ম নিল অসিরিস, নুটের বড় ছেলে। তার পরের দিনটাকে সরিয়ে রাখা হল হোরাসের জন্মের জন্য, মানে নুটের নাতির জন্মানর জন্যে। তৃতীয় দিনে জন্ম নিলে নুটের দ্বিতীয় ছেলে , কালোকুলটি রঙের সেত।   চতুর্থ দিনে জন্ম নিল আইসিস আর পঞ্চম দিনে নেফদীজ।  মজা হল এই যে সূর্যদেবের অভিশাপকে পাশ কাটিয়ে নুটের সন্তানেরা হল।  আর সেই সময়ের প্রথা অনুযায়ী অসিরিস আর আইসিসের মধ্যে, আর সেত আর নেফদীজের মধ্যে পরে বিয়ে হয়েছিল।

অসিরিস যখন জন্মালেন তখম থেবেসের মন্দির থেকে ভবিষ্যৎবাণী হয়েছিল যে এই ছেলে সমস্ত বিশ্বে শান্তি আর আনন্দের উৎস হবে। আর ওদিকে সেত হলেন অন্ধকারের মৃত্যুপূরীর দেবতা।  আইসিস রাএর আসল নাম জেনে ফেলার পরে সমগ্র বিশ্বের রাজপাট চলে গেল তার এবং অসিরিসের হাতে।

অসিরিসের কাছ থেকে মিশরের লোকেরা শিখল কি করে নীলে নদের বন্যার জল সরে গেলে চাষবাস করতে হয়, কিভাবে কাঁচা মাংস খাবার বদলে রান্না করে খাবার তৈরী করা হয়। তার পরে অসিরিস শেখালেন তাদের আইন, সমাজ, আচরণ। মিশরের লোকে হয়ে উঠল সভ্য। এবার অসিরিসের কাজ হল সারা বিশ্বে তার শিক্ষা কে ছড়িয়ে দেবার। এই সব করার জন্য লোকে অসিরিসের ভক্ত হয়ে পড়েছিল আর সেটাই সেত এর হিংসার কারণ হচ্ছিল। 

ওদিকে অসিরিস যখন বিদেশ থেকে দেশে ফিরে এল তখন সেতই প্রথম তাকে সাদরে বরণ করে নিল। এটা কিন্তু ছিল ছল। সেতএর বাহাত্তর জন সহকারী মিলে ঠিক করে নিয়েছিল যে অসিরিসকে মারতেই হবে। সেত রাগে দুঃখে পাগল, ভাবে কি করে অসিরিসের মৃত্যু হবে। ভেবে চিন্তা করে এক উপায় বার করল।

ঠিক অসিরিসের দেহের মাপ অনুযায়ী একটা সুন্দর কাঠের কারুকার্য করা বাক্স বানান হল। আর তার পরে অসিরিসকে এক ভোজসভার নিমন্ত্রণে ডাকা হল। খাওয়ার পরে সেই বাক্স এনে হাজির করা হলে সেত বলে আমি জানিনা যে এটা কোন সৌভাগ্যবানের মাপের হবে, কিন্তু যারই হক না কেন এটা তারই হবে।  সেতএর লোকেরা একের পর একে হুড়োহুড়ি করে চেষ্টা করতে লাগল। কারুরই ঠিক মাপে হয় না। শেষে কৌতুহলের বশে অসিরিস বলে উঠল, আমি দেখি। এই বলে সে বাক্সটার মধ্যে ঢুকতেই দেখা গেল একেবারে ঠিক মাপের। অসিরিস বলে তাহলে এটা আমার।  সেত বলে নিশ্চয়ই সারা জীবনের জন্য। এই বলে বাক্সটাকে পেরেক মেরে বন্ধ করে দিয়ে সীসের চাদরে মুড়ে নীল নদের জলে ফেলে দিল। নীল নদের দেবী হাপী, সেই বাক্সটাকে নিয়ে গেলেন সমূদ্র পারে ফিনিসিয়ার উপকূলে।

 অসিরিসের মৃত্যু হল, কিন্তু না তা নয়। তার আত্মা বেচে রইল। ওদিকে অসিরিসের দেহ নিয়ে বাক্সটা বিবলসের উপকূলের একটা গাছের গোড়ায় গিয়ে পড়ল, গাছটাও পরম মমতার সাথে সেই বাক্সটাকে তার নিজের ভেতরে লুকিয়ে নিল যাতে সেত তার কোন খবর না পায়।

ইতিমধ্যে ফিনিসিয়ার বিবলসের রাজা সস্ত্রীক একবার ঐ উপকূলে এসে গাছটাকে দেখে খুব মুগ্ধ হন আর বলেন এটাকে কেটে আমার প্রাসাদে নিয়ে এস যাতে এটা দিয়ে আমার প্রাসাদের ছাতের জন্য একটা সুন্দর স্তম্ভ বানান যায়। তাই করা হল। ইতিমধ্যে আইসিস তার শিশু পুত্র হোরাস কে নিয়ে কেঁদে কেঁদে সারা বিশ্ব অসিরিসের জন্য পাখী হয়ে খুঁজে বেড়াতে লাগলেন। তার সেই কান্না সাহারার সিমূম ঝড়ের হাওয়ার আওয়াজের মত হয়ে ঘুরতে লাগল। শেষে সেতের ভয়ে তিনি গিয়ে বুটো দেবীর বাসস্থান এক দ্বীপে আশ্রয় নিলেন, আর তার হাতে হোরাসের দায়ীত্ব সঁপে দিলেন। আরও নিরাপত্তার জন্য সেই দ্বীপটাকে তার মূল থেকে আলাদা করে দিলেন যাতে সেটা সমূদ্রে ভাসতে থাকে আর কেউ তার ঠিকানা জানতে না পারে।
   
 তার পরে শুরু হল অসিরিদের দেহটাকে আরও ভাল করে খোঁজা। অনেক এদিক ওদিক খোঁজার পরে দুটি শিশু আইসিসকে খোজ দিলে যে ঐ রকম একটা বাক্সকে তারা নদীরে জলে ভেসে যেতে দেখেছে। আইসিস গেলেন নদী ধরে সমূদ্রের পারে, সেখানে অনেক খোঁজ করার পরে আবার দুটি শিশু তাকে খবর দিলেন বাক্সটা কোন দিকে গেছে। আইসিস খুসী হয়ে বলে দিলেন যে শিশুরা এর পর থেকে সত্যি কথাই বলবে।

আইসিস অসিরিসের দেহ খুজতে খুজতে গিয়ে বিবলসে হাজির হলেন। এক ঝর্ণার ধারে  বসে ভাবছেন কোথায় খোঁজ পাওয়া যায়, এর মধ্যেই বিবলসের রানীর চাকরাণিরা এক দিন ঐ ঝর্নাতে স্নান করতে এলে আইসিস তাদের চুলে ভাল করে বিনুনী করে সাজিয়ে দিলেন। তারা রাজপ্রাসাদে পৌছালে রাণি তাদের বিনুনী দেখে এবং গায়ে সুগন্ধ পেয়ে সব জিজ্ঞেস করলে তারা সব কথা বলে। রাণিমা গিয়ে আইসিসকে প্রাসাদে নিয়ে আসেন। আর তার ছোট ছেলে ডিক্টিসকে দেখভাল করার কাজ দিয়ে দেন।
ছোট্ট ডিক্টিসকে আইসিসের খুব পছন্দ হয়ে গেছিল। তাই তাকে তিনি অমর করে দিতে চাইছিলেন। সেই হিসাবে রোজ রাত্রে ডিক্টিসের শরীরে আগুন লাগিয়ে তার নশ্বর দেহটাকে একটু একটু করে পুড়িয়ে দিতে লাগছিলেন। কিন্তু রাণীমা একদিন দেখে ফেলায় ঘরে ঢুকে পড়েন আর আইসিসের দেবীচেহারা দেখে ফেলেন। ডিক্টিজকে অমর করার এই কাজ আর সমাপ্ত হয় না। ইতিমধ্যে আইসিস রাণীমার কাছে সেই স্তম্ভটা চান। রাণিমা খুসীমনে সেটা তাঁকে দিয়ে দেন।

স্তম্ভ থেকে অসিরিসের দেহ ভর্তি বাক্সটা বার করে নিয়ে  স্তম্ভটা আইসিস রাণিমাকে ফেরত দিয়ে দিলেন যাতে তার প্রাসাদের ছাতের কোন ক্ষতি না হয়।। আর বাক্সটা নিয়ে আইসিস মিশরের দিকে রওয়ানা দিলেন। নিশরে পৌঁছে দেখেন তার অবর্তমানে তখন সেত রাজত্ব করছে। তাই সেই বাক্সটাকে এক ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রেখে  হোরাসকে আনতে বুটোর কাছে চলে গেলেন। 
ওদিকে সেত একদিন শূয়োর মারার জন্য তার লোকজন দলবল নিয়ে ঐখানেই এসে পড়ল। কুকুরেরা ঝোপের ভেতর থেকে সেই বাক্সটাকে আবিস্কার করলে, সেত রাগে লাল হয়ে উঠল। ক্ষেপে গিয়ে কুড়ুল দিয়ে অসিরিসের শরীরটাকে বিয়াল্লিশ টুকরো করে নীল নদে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হল যাতে নদের কুমিরেরা তার দেহটাকে খেয়ে নেয়। কিন্তু কুমীরেরা কি বুঝে সেটা আর খায়নি। খালি সেহের একটা টুকরো এক মাছে খেয়ে নিয়েছিল। সেই থেকে মিশরের লোকেরা সেই মাছটা আর খায় না।

আইসিস আবায় কষ্ট করে অসিরিসের দেহের টুকরোগুলো জোগাড় করে তাকে কাপড় জড়িয়ে আসল চেহারার মত করে লুকিয়ে রেখে দিল।যদিও দেহের সমস্ত টুকরো গুলো পাওয়া যায় নি তবুও আইসিস তার যাদু ক্ষমাতার বলে সেটাও তৈরী করে নিলেন।এদিকে সেত গর্ব করে বলে বেড়াতে লাগল যে ভগবানের মৃত্যু হয় না, কিন্তু আমি অসিরিস ভগবানের দেহটাকে টুকরো টুকরো করে তাঁকে মেরেছি। কিন্তু এবার তার স্ত্রী নেফদীজ আর সেতের সংগ দিল না, সে চলে গেল অসিরিসের দলে। এবং আইসিসের খোঁজার ব্যপারে আইসিসকে সাহায্য করতে লেগেছিল। আর অসিরিসের দেহটা আবার জোড়া দিয়ে তৈরী করার পরে তার আত্মা চলে গেল মৃতদের রাজত্বে। অপেক্ষা রইল সেই দিনের যে দিন হোরাস আর সেতের লড়াইএ হোরাসের জয় হবে।

হোরাস বড় হয় আর তাঁকে অসিরিসের আত্মা এসে নানান ভাবে জ্ঞান দ্যায়। একবার এই রকম জিজ্ঞেস করা হল যে পৃথিবীতে সবচেয়ে মহান কাজ কি। হোরাসের উত্তর ছিল যে বাপ-মার প্রতি অন্যায়ের বিরুদ্ধ লড়ে তার প্রতিকার করা। আবার জিজ্ঞাসা করা হল যে তাতে সবচেয়ে কোন জন্তুর দরকার পড়তে পারে, হোরাসের উত্তর ছিল ঘোড়ার, কিন্তু কেন সিংহ নয় প্রশ্ন করা হলে হোরাস বলে যে সিংহ তো সাহায্যের দরকার হলে কাজে আসবে, কিন্তু ঘোড়া শত্রুকে ধাওয়া করে তাকে ধরতে কাজে লাগবে।  অসিরিস বুঝলেন সময় হয়েছে সেতের বিরুদ্ধে হোরাসের লড়াইতে যাবার।

লড়াই শুরু হল। সেত এক বিশাল বুনো শূয়োরের চেহারা ধরে এসে হোরাসকে আক্রমন করল, কেননা অসিরিস আর রাএর দেওয়া জ্ঞানের মধ্য এই ব্যপারে হোরাসকে কিছু বলা ছিল না। হোরাস তার চোখে আঘাত পেয়ে যন্ত্রণাতে কাতর হলে সূর্যদেব রা তার আলো কমিয়ে অন্ধকার করে দেন আর হরাসের যন্ত্রনা উপশম হয়। কিন্তু ততক্ষনে সেত যুদ্ধ ছেড়ে পালিয়েছে।

এই রকম ভাবে দফায় দফায় যুদ্ধ হতে থাকে কিন্তু কেউই শেষ পর্যন্ত জেতে না। অসিরিস তার দিনের অপেক্ষায় থাকে যেদিন সেত একেবারেই পরাজিত হবে আর সে আবার গিয়ে মিশরের লোকেদের সুখ শান্তির বৃদ্ধি করবে।

আমরাও সেই দিনের অপেক্ষায় থাকি যে দিন ন্যায় আন্যায়ের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে অন্যায়কে পৃথিবীর বুক থেকে একেবার সরিয়ে দিতে পারবে।  

বুধবার, ২৩ জুলাই, ২০১৪

আটলান্টা।

আটলান্টা।

আটলান্টা, আমেরিকার এক শহর,যেখানে কিছুদিন আগেই অলিম্পিকের খেলকুদ হয়ে গেছে। কিন্তু আটলান্টা নামটা জড়িয়ে আছে এক বিখ্যাত দৌড়বিদ মহিলার নামের সাথে। এনাকে অবশ্যি মানবী শরীরে দেখা যায় নি। ইনি ছিলেন গ্রীক পুরানের এক চরিত্র। চরিত্র এই জন্য বললাম যে এনাকে কিন্তু অমর বা দেবদেবীদের পর্যায়ে ফেলা হয় নি। ইনি ছিলেন রাজা আয়াসাসের মেয়ে। মার নাম ক্লিমেনী।

আজকের ভারতীয় সমাজের মত মেয়ে হিসাবে জন্মেছিলেন বলে তার বাবা তাঁকে কাছে চাননি। জঙ্গলে ফেলে দিয়ে আসতে হুকুম করেছিলেন। সেই অনুযায়ী তাঁকে ফেলে দিয়ে আসা হল জঙ্গলে। কিন্তু ঠান্ডা লেগে মরে যাবার আগেই এক মা-ভল্লুক তাঁকে নিজের বাচ্চার মত পালতে লাগল।  আমরা বেশ কিছুদিন আগে ওড়িষাতে  এক নেকড়ে মানুষের কথা কাগজে পড়েছিলাম, তার মতন ব্যপারটা। এই ভল্লুকীটাকে পাঠিয়েছিলেন আর্টেমিস, আটলান্টাকে বাচিয়ে রাখবার জন্য। ঐ ভাল্লুক মার কাছে আটলান্টা বড় হল আর শিকারীর দলে মিশে গেল। আসলে যদিও আটলান্টা ভাল্লুকের কাছে বড় হয়েছিল তবুও জঙ্গলে থাকার সময় সে শিকার করতে শিখে গেছিল।

ইতিমধ্যে ক্যালিডনের রাজা ইনিয়াস একবার তার বাৎসরিক ফসল তোলার পুজোতে আর্টেমিসকে পুজা দিতে ভুলে যান। বাস আর্টেমিসের মেজাজ গরম। শাস্তি হিসাবে পাঠালেন এক বিশালকায় শূকরকে । সে এসে ক্যালিডনের ক্ষেত খামার, মানুষের সম্পত্তি নষ্ট করতে শুরু করে দিল। লোকে ভয়ে ঘরের বাইরে যাওয়া বন্ধ করে দিল। শহরের বাজারে ফসলের কম পড়তে শুরু হয়ে গেল। ইনিয়াস ডেকে পাঠালেন দেশের সমস্ত শিকারীদের যাতে তারা এসে শূকরটাকে মারতে পারে। যে মারতে পারবে তাকে প্রাইজ হিসাবে শূকরটার মাথা আর চামড়াটা দেওয়া হবে।

মারার জন্য যে সমস্ত শিকারী এসে হাজির হলেন তার মধ্যে ছিল এই আটলান্টা আর ইনিয়াসের ছেলে মেলিয়াজর। কিন্তু আটলান্টাকে মেয়ে দেখে কিফফেস আর আঙ্কিয়স নামের দুজন শিকারী তার সাথে শিকারে যেতে রাজী হল না। বাধ্য হয়ে মেলিয়াজর তাদের কোনরকমে রাজী করাল।

আবার শিকারের সময় দুজন থেসালীর অর্ধ মানব, হাইলিয়াস আর রিকাস, আটলান্টাকে মেয়েছেলে দেখে অত্যাচার করার ইচ্ছে নিয়ে জোর করতে গেলে আটলান্টা তার তীর চালিয়ে দুজনকেই মেরে ফেলেন। শিকার, শূকরের রক্তের বদলে ঐ অর্ধ মানবদের রক্ত দিয়ে সুত্রপাত হল। শেষ পর্যন্ত সেই শূকরটাকে প্রথম তীর মারতে পারল আটলান্টাই। মেলিয়াজর এসে সেটাকে তলোয়ারের আঘাতে শেষ করে দিল।

আটলাণ্টাকে দেখে মেলিয়াজরের মনে একটু ভালবাসা আর শ্রদ্ধার উদয় হয়েছিল তাই প্রথম আঘাত করার অজুহাতে প্রাইজ যেটা দেওয়া হবে বলা হয়েছিল সেটা আটলান্টাকেই দেবার জন্য বলে দিল। কিন্তু থেশটিয়সের ছেলেরা আটলান্টার কাছ থেকে সেই প্রাইজ ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করলে মেলিয়াজর তাদের মেরে ফেলেন আর আবার সেই প্রাইজ আটলান্টাকে দিয়ে দেন।

এরা সম্পর্কে মেলিয়াজরের মামা ছিলেন। আগেই ভবিষ্যতবাণী হয়েছিল যে  কুন্ডের কাঠ পুরে ছাই হলেই মেলিয়াজর মারা যাবে। সেই জন্য মেলিয়াজরের মা অ্যালথিয়া কুন্ড থেকে আধপোড়া কাঠটাকে নিয়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন।ভাইদের মৃত্যু দেখে অ্যালথিয়া রেগে গিয়ে সেই কুন্ডের কাঠটাকে বার করে আগুনে ছুড়ে ফেলে দেন।   যা হবার তাই হল, মেলিয়াজরের মার ছোঁড়া কাঠটা পুরে ছাই হয়ে গেল আর মেলিয়াজর মারা গেল।

এইবার আটলান্টা বীর হিসাবে সব জায়গাতে দ্বীকৃতি পাওয়াতে তার বাবাও তাঁকে নিজের বলে স্বীকার করে নিলেন। আটলান্টা তার বাবার কাছে এলেন। এখন তিনি রাজপুত্রী, সাধারণ শিকারী নন। তার বাবা তাঁকে বিয়ে  করানোর ইচ্ছে করলে আটলান্টা এবার আর না করল না। কিন্তু তার মনে তো বিয়ের কোন ইচ্ছেই ছিল না। সোজাসুজি না বললে বাবা তাঁকে শাস্তি দিতে পারে তাই সে এক শর্ত রাখল।

তাঁকে যে দৌড়ে হারাতে পারবে সেই তাঁকে বিয়ে করতে পারবে। কিন্তু যদি আটলান্টা জিতে যায় তবে পরাজিতের তাদের প্রাণ  হারাবে,কারণ আটলান্টাকে দৌড়ে তো কেউ হারাতে পারবে না তাই তার বিয়েও হবে না। লোকে আসে আর হেরে গিয়ে প্রাণ দ্যায়। 

এদিকে আর্কাডিয়ার মেলানিওন আটলান্টাকে খুব ভালবেসেছিল। সে তাঁকে বিয়ে করবার মন করলে এক চিন্তা তো তাঁকে পেয়ে বসে। কি করে দৌড়ে আটলান্টাকে হারান যেতে পারে। সে ধরে পরল আফ্রাদাইতিকে। প্রেমের দেবী আফ্রাদাইতী, তাঁকে এক প্ল্যান দিলেন আর তিনটে সুন্দর সোনার আপেল দিলেন। কিন্তু সাথে বলে দিলেন যে জিতে আটলান্টাকে পেলে পরে দুজনে মিলে তার পূজা দিতে হবে। মেলানিয়ন রাজী।

এবার মেলানিয়ন এসে আটলান্টাকে বলল আমি রাজী তোমার সাথে দৌড় প্রতিযোগীতাতে, আটলান্টা বলে, তুমি জান যে হেরে গেলে তোমার প্রাণ যাবে। মেলানিয়ন বলে আগে হারি তো। দৌড় শুরু হল। বেশ কিছুদূর যাবার পরে যেমনি আটলান্টা আগে এগোচ্ছে অমনি মেলানিয়ন তার হাত থেকে একটা আপেল সামনের দিকে রাস্তায় গড়িয়ে দিল। আটলান্টা দাঁড়িয়ে ওটা তুলে নিয়ে দেখতে দেখতে মেলানিয়ন আবার এগিয়ে গেল।
আটলান্টা আপেলটাকে ফেলে দিয়ে আবার দৌড় শুরু করল। আবার যখন প্রায় কাছাকাছি এসে গেছে তখন মেলানিয়ন তার দ্বিতীয় আপেলটাকে রাস্তার পাশের দিকে এমন ভাবে ছুড়ে দিল যে সেটা তুলতে গেল একটু রাস্তার বাইরের দিকে নামতে হবে। তাই হল আটলান্টা তোর কৌতূহল মেটাতে রাস্তা ছেড়ে গিয়ে আপেলটা তুলে নিয়ে দেখতে শুরু করল, ইতিমধ্যে মেলানিয়ন আবার অনেকটা এগিয়ে গেল।

আটলান্টা আবার দৌড় সুরু করল, এইবার আবার মেলানিয়ন তার শেষ আপেলটাকে রাস্তায় গড়িয়ে দিতে, আটলান্টার পক্ষে লোভ সামলান সম্ভব হল না। সে থেমে ওটাকে তুলে দেখে আবার দৌড় শুরু করে সীমানাতে পৌঁছানোর আগেই মেলানিয়ন সীমারেখা পার করে গেছে। আটলান্টাকে হারতে হল।

বেশি ধুমধামের সাথে দুজনের বিয়ে হয়ে গেল। কিন্তু তারা এতই আনন্দে মশগুল যে আফ্রাদাইতীকে যে পূজা দেবার কথা দেওয়া আছে তার ব্যপারে একদম ভুলে মেরে দিল। আফ্রাদাইতীর রাগ। সে রেগে গিয়ে দুজনকেই সিংহ বানিয়ে দিল।


এখানে একটা কথা । আটলান্টা তো সিংহ হয়ে গেল কিন্তু তার একটা ছেলে হয়েছিল নাম পার্থেনপাস। সেও পরে বড় হয়ে বিরাট বীর হয়েছিল। 

    

সোমবার, ২১ জুলাই, ২০১৪

সিসিফাস


রাজা সিসিফাস। গ্রীক পুরানের এক শয়তানী বুদ্ধি ওয়ালা রাজা। থেসালীর রাজা ইয়োলাসের ছেলে। সালমোনাসের ভাই, এমনিতে রাজা মশাই জ্ঞানী গুণী, ব্যবসা আর নৌচালনা সম্বন্ধে বিশেষ জ্ঞান রাখতেন। তার রাজ্য এই দুটো ব্যপারে বেশ উন্নত ছিল। কিন্তু  ভীষন লোভী আর ঠকবাজ ছিলেন। অবশ্যি ব্যবসাতে উন্নতি করতে গেলে সাধারণত এ দুটোর খুব দরকার পড়ে। আর আতিথ্য জিনিষটা কি তা জানতেন না বরং তার কাছে অতিথিদের অনেককেই মরতে হয়েছে।  একজন কঠোর রাজা হিসাবে সিসিফাসের বেশ নামডাক ছিল। এদিকে তার ভাই এর সাথেও বিশেষ বনিবনা না থাকায় কি ভাবে ভাই সালমোনাসকে মেরে ফেলা যায় তার প্ল্যান কষতে ডেলফির জ্যোতিষীদের কাছে মতামত নিতে গেছিলেন।
নদীর দেবতা আসপসের মেয়ে আইজিনাকে জুস কোথায় নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন সেটাও তার বাবার কাছে জানিয়ে দিতে ভোলেন নি। তার ফল হল করিন্থের  সভাঘরের মাঝ দিয়ে এক ফোয়ারা উঠে সভাঘরটাকে নষ্ট করে দিল।
মানে তার কীর্তিকলাপে সবাই অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। জুসের শাস্তি আসবেই। জুস বলে দিলেন থানেটসকে যে চিত্রগুপ্ত হিসাবে কাজ করছিল তাঁকে যে যাও গিয়ে সিসিফাসকে ধরে বেঁধে নিয়ে এস।
সিসিফাস দেখে থানেটস এসে হাজির। ভাবল সাধারণত সংবাদ বাহক  বা পিয়ন হিসাবে তো হারমিস কাজ করে , সে কেন আসে নি। কূটবুদ্ধি তার মাথায় গজগজ করছে। থানেটসকে ভাল মানুষের মত জিজ্ঞেস করে বসল তার চেনটা দিয়ে কি ভাবে কাউকে বাধা হয়। থানেটস ভাল মানুষের মত যেই দেখাতে গেছে অমনি সিসিফাস তাকে ঐ চেন দিয়ে বেঁধে রাখল। চারদিকে হাহাকার, থানেটস পৃথিবীতে আটকা পরে আছে, যতক্ষন না সে যমপূরীতে ফিরে যাবে ততক্ষণ কোন লোক মারা যাবে না। কিন্তু লোক তো জন্মাবে। অর্থাৎ কিছুক্ষণের মধ্যে পৃথিবীতে লোকের ভীড় লেগে যাবে। যুদ্ধের দেবতা শেষ পর্যন্ত তার শত্রুপক্ষের লোকে মরছে না দেখে ক্ষেপে গিয়ে সিসিফাসকেই আটকে রেখে দিলেন। থানেটস মুক্তি পেল। আর সিসিফাসকে নিয়ে যমপূরীর দিকে রওয়ানা দিল।
কিন্তু সিসিফাসের বুদ্ধি কি তাতেই হার মানে।
থানেটস তাঁকে নিয়ে যাবার আগে সে তার স্ত্রীকে বলে দিল যে তার সমস্ত জামাকাপড় খুলে নিয়ে রাস্তার চৌমাথায় দেহটাকে মরে যাবার পরে ছুড়ে ফেলে দিতে। সিসিফাসের স্ত্রীর মাথায় কারণটা ঠিক ঢোকে নি কাজেই সে তাই করল। এইবার সিসিফাসের প্রেতাত্মা ষ্টীক্স নদীর পাড়ে গিয়ে দাড়িয়ে আছে, আগে যাবার হুকুম নেই। যমের জিজ্ঞাসাতে সিসিফাস বলল যে তার অন্তিম সংস্কার এখনো হয়নি। তার স্ত্রী কেন জানিনা কাজ করে নি, কাজেই সে চায় পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে স্ত্রীকে দিয়ে অন্তিম সংস্কার করিয়ে তার পর ফিরে আসবে।  বাধ্য হয়েই পেরসেফণি (যমরাজা) তাঁকে আবার ফেরত গিয়ে তার স্ত্রীকে দিয়ে অন্তিম সৎকার করিয়ে আসতে বলল। আর তাঁকে ফেরত পাঠিয়ে দিল। সিসিফাস খুসী মনে ফিরে এল। তার স্ত্রীকে এল্টু লোকদেখান বকুনী লাগাল। বাস অতটাই। তাঁকে যে অন্তিম সৎকার করিয়ে ফিরে যেতে হবে তার আর হুঁশ নেই।
বাধ্য হয়েই যমরাজ তাঁকে জোর করেই যমপূরীতেই টেনে আনলেন। আর শাস্তি বললেন, তোমার যখন পৃথিবীতে থাকার এতটা সখ তুমি যাও, তোমায় কিন্তু একটা কাজ আগে করতে হবে । ঐ বড় পাথরটাকে গড়িয়ে নিয়ে পাহাড়ের ওপারে ঠেলে ফেলতে হবে। আর ওপারে চলে গেলেই তুমি নর্মাল। কিন্তু পাথরটাকে ওপারে নিয়ে যেতে না পারলে তোমার কাজ শেষ হবে না।
সিসিফাস লাফাতে লাফাতে চলে গেল পাথরটাকে গড়িয়ে পাহাড় ডিঙ্গিয়ে ওপারে নিয়ে যেতে। কিন্তু জুসের সাথে চালাকী? জুস ঐ পাথরটাকে মন্ত্র বলে এমন করে দিলেন যে যখনি পাথরটা পাহাড়ের চূড়াতে পৌছায় তখনই সেটা আবার সিসিফাসের হাত ফস্কে নিচে গড়িয়ে আসে। সিসিফাসকে আবার নীচে এসে ওটাকে উপরে নিয়ে যাবার চেষ্টা করতে হয়।
এখনো কিন্তু সিসিফাস ঐ কাজটা করে যাচ্ছে। আর মনে হয় কোন দিনই কাজটা শেষ হবে না।  চালাকী দ্বারা মহৎ কাজ হয় না।      


 

শুক্রবার, ১৮ জুলাই, ২০১৪

ট্যান্টালাসের কথা

ট্যান্টালাসের কথা


আমাদের মধ্যে যারা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করেছেন তারা ট্যান্টালাস কাপ এর এক্সপেরিমেন্ট করেছেন বা দেখেছেন। একটা কাপের মধ্যে একটা মূর্তি থাকে আর তাতে জল ঢালতে লাগলে যখনই লোকটার মুখের কাছে জল পৌছায় তখনই কাপের থেকে নীচ দিয়ে বেড়িয়ে যায়। লোকটার ঠোঁট অবধি আর পৌছায় না।  মূর্তিটার জল খাওয়া আর হয়ে ওঠে না। সাথের ছবিটাতে এই রকম একটা কাপের আধখানা কেটে দেখান হয়েছে। ট্যান্টালাসের মুর্তি থাকবে ঠিক মাঝের অংশটাকে ঘিরে।

 কিন্তু কে এই লোকটা যার নাম  ট্যান্টালাস। ইনি গ্রীক পুরানের এক চরিত্র।  জুস দেবের ছেলে, তাঁকে সারাক্ষন তৃষ্ণার্ত করে রাখার শাস্তি কে দিল আর কেনই বা।  অবশ্যি তার দোষটা ছিল মারাত্মক। জুসের ছেলে তাই দেবমহলে তার আনাগোনা হামেশাই। একসাথে পানভোজন চলে।  আমাদের মত রিটার্ন ফিষ্ট দেবার কথাও থাকে। এমনি  এক ভোজসভা যখন ট্যান্টালাসের বাড়িতে হবে, তখন ট্যান্টালাসের মাথায় এক কুবুদ্ধি জেগে উঠল। ট্যান্টালাস দেখতে চাইল যে জুস তো বলে সে সব কিছু জানতে পারে, বুঝতে পারে, একবার পরীক্ষা করেই দেখা যাক।  সিপিলসের রাজা তিনি, তার পক্ষে বিশেষ কিছু করা একটা খুব কঠিন কাজ নয়।

ট্যান্টালাসের ছেলে ছিল পেলপ্স। ট্যান্টালাস পেলপ্সকে মেরে তাকে টুকরো করে মাংসের সাথে মিশিয়ে রান্না করে ফেলল। মানুষের মাংস রান্না তা কি হয়েছে। গ্রীক পুরাণ ঘাঁটলে এরকম হাজার উদাহরণ পাওয়া যাবে। আর নিজের ছেলে মেয়ের কথা। তাও আছে । আগামেমনন ট্রয় যুদ্ধে যাবার আগে আর্টেমিসকে তুষ্ট করতে যে ভোজসভার আয়োজন করেছিলেন, তাতে তার মেয়ে ইফাগানিয়াকে মেরে তার মাংস দিয়ে ভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। আগামেমনন আবার এই ট্যান্টালাসের নাতির ছেলে।

খাবার খেতে বসে জুস একটা সন্দেহ করে ট্যান্টালাসের কাছে মাংসের হাড়িটা দেখতে চাইলেন, বাস এবার তো ধরা পরে গেছে কাজেই শাস্তি। কিন্তু পেলপ্সের কি হবে। বেচারাকে নাহক মরতে হয়েছে। জুস তাই তাঁকে আবার বাচিয়ে তুললেন। ইতিমধ্যে অন্য দেবতারা খাওয়া চালু করে দিয়েছিলেন। ডেমেটার এক টুকরো মাংস তো খেয়েই ফেলেছিলেন, সেটা আবার দেখা গেল পেলপ্সের কাঁধের টুকরো। কি করা যায়? কাঁধ ছাড়া পেলপ্স? তাহলে তো কাজকর্মে অসুবিধা হবে। ডেমেটার তাই একটা হাতীকে মেরে তার দাঁত দিয়ে কাঁধের ঐ জায়গাটা বানিয়ে লাগিয়ে দিলেন। সব ঠিক হয়ে গেল।

এবার ট্যান্টালাসের শাস্তি। তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়ে তারতিয়াস হ্রদের মধ্যে আটকে রাখা হল। একটা আপেল গাছের নীচে। ট্যান্টালাসের জল তেষ্টা পেলে সে যেই হ্রদের জল খেতে যায় অমনি জল দূরে সরে যায়। আবার আসতে আসতে জল কাছে চলে আসে। মানে লোভ দেখিয়ে জ্বালাতন করা। আর ক্ষিদে পেলে, সেখানেও হাতের কাছেই ফল, কিন্তু পাড়তে গেলেই ফলগুলো শুদ্ধু ডালটা উপরে সরে যাবে এমনই অবস্থা।

অনাদিকাল থেকে ট্যান্টালাসকে তার শাস্তি এইভাবেই পেয়ে যেতে হচ্ছে। ইংরাজী ট্যান্টালাইজ (Tantalize)কথাটা এই ট্যান্টালাসের নামের থেকেই এসেছে।


প্রমিথিয়াস

বিশৃঙ্খলার মধ্যে যখন বিশ্বের আদি পর্ব চলছে তখন আকাশ, সমুদ্র আর পৃথিবী আলাদা হবার পরে দেবতারা ঠিক করলেন যখন সমস্ত দেবদেবীর সাথে টাইটানদের যুদ্ধে টাইটানেরা জয়ী হয়েছেন তখন মানুষের সৃষ্টি করা যাক।  এখন তাদের  বসবাস করের জন্য জমির সৃষ্টি হয়েছে। আরা এই মানুষেরাই তো দেবদেবীদের পুজা অর্চনা করবে।  অতএব মানুষ তৈরী করার ভার দেওয়া হল প্রমিথিয়াসকে আর সাথে তার ভাই এপিমিথিয়াসকে।

লেগে পড়লেন দুজনেই তাদের কাজে। এপিমিথিয়াস  হঠকারী গোঁয়ার, বুদ্ধিবিবেচনা একটু কম।  পিছনের অভিজ্ঞতা তার সব কাজেই সে লাগাতে চায়, কোন কিছুতে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চায়না। আর সে জায়গাতে প্রমিথিয়াস ধীর স্থির, বুদ্ধিমান এবং যথেষ্ট বুদ্ধি সম্পন্ন, প্রচুর দুরদৃষ্টির অধিকারী।

এপিমিথিয়াস চটপট কিছু প্রাণীর সৃষ্টি করলেন যারা কেউ জঙ্গলে থাকবে, কেউ আকাশে উড়বে, আবার কেউ জলেও চলে বেড়াবে। মানে জানোয়ার, পাখী, মাছ ইত্যাদি তৈরী হয়ে গেল। ওদিকে প্রমিথিয়াস ধীরে ধীরে মাটী দিয়ে দেবতাদের আদলে মানুষ তৈরির কাজে লেগে রইলেন। তিনি চাইলেন যে মানুষেরা যেন উপর দিকে তাকিয়ে ভগবানকে দেখতে পারে। তার সৃষ্টি সম্পুর্ণ হতে অনেক সময় লেগে গেল। 

তার মধ্যে এপিমিথিয়াস তার তৈরী করে প্রাণীদের কাউকে দিলেন গতি, কাউকে দিলেন ধারাল নখ আক্রমণ করার জন্য, কাউকে বা শক্তি। ওদিকে প্রমিথিয়াসের মানুষ সৃষ্টি শেষ হলে দেখা গেল ভগবানের দেওয়া গুণ গুলোর প্রায় সবই এপিমিথিয়াস তার তৈরী প্রানীদের কাজে লাগিয়ে ফেলেছে। মানুষের জন্য কিছুই পড়ে নেই। মানুষ নিজেকে নিজে রক্ষা করার মত কোন কিছুর অধিকারী হতে পারেনি। সে এক উলঙ্গ শিশুর মত সহায়সম্বলহীন হয়ে রয়েছে।

প্রমিথিয়াস খুব মুশড়ে পড়লেন। কি করা যায়। দিন রাত মানুষদের জন্য চিন্তা করে অলিম্পাস পাহাড়ে আর তার থাকতে ভাল লাগে না, চলে এলেন তিনি মানুষদের সাথে থেকে যদি তাদের কোন কিছু সুবিধা করে দিতে পারেন। এদিকে মানুষেরা তো দেবদেবীদের পূজা করবে আর তাদের অর্ঘ্য দেবেই। প্রমিথিয়াস দেখলেন যে সমস্তটাই তো দেবতারা নেন না, এদিক ওদিক থেকে নিয়ে বাকীটা ছেড়ে দেন। তিনি জুসের কাছে আর্জি করলেন যে বলির পশুর একটা নির্দিষ্ট ভাগ আপানি নিয়ে বাকীটা মানুষদের জন্য ছেড়ে দিন। জুস  বললেন, আমি তো ঠিক করব কোন ভাগটা আমি নেব। প্রমিথিয়াস বললেন এটা কিন্তু বরাবরের জন্য, আজ এই ভাগ, কাল ঐ ভাগ করলে মানুষদের অনেক অসুবিধা হচ্ছে , জুস বললেন তথাস্তু।

প্রমিথিয়াস করলেন কি একটা পশু মেরে এক ভাগে তার মাংসটাকে ছাল দিয়ে ঢাকা দিয়ে রাখলেন, আর অন্য ভাগে মাথাটা, থানাথানা চর্বিওয়ালা হাড়ের টুকরো রাখা হল। জুসকে এবার ডেকে তার ভাগটা বেছে নিতে বলা হল। জুস দেখে এক দিকে অল্প কিছু মাংস পশুর ছাল দিয়ে ঢাকা আছে। আর অন্য দিকে বিরাট মাথাটা আর চরবি সমেত বড় বড় হাড়ের টুকরো রাখা আছে, দেখতে অনেকখানি। জুস ঠিক করে নিলেন এই বেশী জিনিষের ভাগটাই নেবেন।  সেই থেকে মানুষেরা জানোয়ার মেরে তার মাথা আর হাড় পুজার জন্য ছেড়ে নিজেরা মাংসের ভাগ পেতে লাগল। জুস দেখল যে সে ঠকে গেছে, কিন্তু নিরুপায়।

তার পরে প্রমিথিয়াস দেখলেন মানুষেরা ঠান্ডায় কষ্ট পাচ্ছে, কাঁচা মাংস তাদের খেতে হচ্ছে। ভাবলেন যদি এদের আগুন জ্বালানোর ক্ষমতা দেওয়া যেত তবে এরা নিজেদের রক্ষা করতে পারত,। কিন্তু আগুন তো খালি  দেবরাজ জুসের কাছেই অলিম্পাস পাহাড়ে আছে। জুস কি তার থেকে কিছুটা মানুষদের জন্য দেবেন?

প্রমিথিয়াস গেলেন আর্জি নিয়ে জুসের কাছে, একটু আগুন যদি আপনি দেন তবে আমার তৈরী মানুষেরা নিজেদের রক্ষা করতে , শীতে গুহার ভেতরে কষ্ট না পেয়ে থাকতে পারে। জুস এমনিতে বেশ হঠকারী দেবতা, সোজা বলে দিলেন এক্কেবারেই না। কোন মতেই মানুষদের আগুনের ভাগ দেওয়া হবে না।

জুসের স্ত্রী হেরা, বরাবরি জুসের সাথে বিরোধে থাকতেন। তিনি প্রমিথিয়াসকে বলে দিলেন আমি তোমাকে সাহায্য করব। তুমি কিছু উপায় চিন্তা কর। প্রমিথিয়াস এক সময় দেখলেন, মৌরী গাছের ডালগুলো ফাপা কিন্তু তার ভেতরের অংশটা একটু ভিজে ভিজে থাকে,  বাস পেয়ে গেছি। এইবার সোজা জুসের দরবারে গিয়ে একটু সুযোগ বুঝে ঐ মৌরী গাছের ডালের ডগাতে বজ্রের একটু স্ফুলিং নিয়ে নিতেই সে আগুন ভেতেরের ভিজে অংশে চলে গিয়ে আস্তে আস্তে এগোতে লাগল। প্রমিথিয়াস সেই আগুন ওয়ালা ডালটা নিয়ে সোজা এক দৌড়ে মানুষদের গুহাতে, লোকদের ডেকে সেই আগুন কে বাচিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হল। লোকেরা আলো তাপ সব পেয়ে সুখে রইল।

ইতিমধ্যে একদিন জুস অলিম্পাস পাহাড় থেকে দেখলেন যে নীচে আলো, তার মানে আগুন। কোথা থেকে পেল, একটু খোঁজ করতেই জানা গেল প্রমিথিয়াস সেই আগুন জুসের বজ্রের থেকে চুরি করে মানুষদের দিয়েছে। বাস তাহলে শাস্তি দিতে হয়। চুরি মহাঅন্যায় আর যখন জুস আগুন দিতে মানা করেছিলেন তখন পরমিথিয়াস সেটা চুরি করে ভীষণ অন্যায় করেছে,। তার আগে বার বার জিজ্ঞাসা করা সত্ত্বেও প্রমিথিয়াস জুসকে বলেন নি যে তার কোন ছেলে তাঁকে রাজ্যচ্যুত করবে তার মানে প্রমিথিয়াস জুসের বিরোধী পক্ষ।

প্রমিথিয়াসকে ধরে আনা হল। তাঁকে ককেশাস পাহাড়ে শেকল দিয়ে বেঁধে আটকে রাখা হল। রোজ জুস একটা ঈগল পাখীকে পাঠাতেন প্রমিথিয়াসের পেটের থেকে মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে । আর রোজ রাত্রে প্রমিথিয়াস অমর বলে তার ক্ষত নিরাময় হয়ে যেত। এই শাস্তি চলল বহুদিন। জুস বলে দিয়েছিলেন প্রমিথিয়াসের  বদলে কারুর প্রান চাই, এবং কোন মর্তবাসী এসে ঈগল্টাকে মেরে প্রমিথিয়াসকে শেকল থেকে মুক্ত করতে হবে। আর নয়তো তার কোন ছেলে জুসের রাজয়্ব নিয়ে নেবে সেটা তাঁকে জানাতে হবে। আর না হলে বাধা থেকে থেকে প্রমিথিয়াস পাহারের একটা অংশই হয়ে যাবে। শেষে হেরাক্লেস এসে ঐ ঈগলটাকে মেরে ফেললেন আর চিরান এবং সেন্টর , দুজনে প্রমিথিয়াসের বদলে মরবার জন্য রাজী হয়ে গেলে প্রমিথিয়াস ফিরে এলেন।   


সোমবার, ৭ জুলাই, ২০১৪

আসুন অঙ্ক শিখি

আসুন অঙ্ক শিখি  প্রথম এবং দ্বিতীয় খন্ডে আমার অসাবধানতাবশতঃ এই সূত্রটির জায়গাতে অন্য কিছু লেখা চলে গেছিল। জনৈক নামহীন পাঠক এই ত্রুটি ধরিয়ে দিয়ে আমাকে ঋণজালে আবদ্ধ করেছেন। তাঁকে অনেক ধন্যবাদ।


অন্তর্দশকেপি সুত্র


যখন গুনক দুটি বাদিকের খন্ড দুটি সমান এবং ডান দিকের অংশ দুটির যোগফল দশ (১০) বা তার গুনিতক (যথা ১০০, ১০০০, ১০০০০) হবে তখন এই সূত্রের প্রয়োগ করা হবে। উদাহরণ হিসাবে আমি এখানে কয়েকটি অঙ্ক করে দেখাচ্ছি।

প্রথম উদাহরণঃ
১২  X  ১৮
এখানে গুনক দুটির বাদিকের খন্ড হল ১ এবং ডান দিকের খন্ডের যোগফল  ২ + ৮ = ১০
এই অবস্থাতে প্রথমে ডান দিকের খন্ডের অংশ দুটিকে গুন করছি।
অর্থাৎ ২ X ৮ = ১৬ ; এই সংখ্যাটি আমাদের উত্তরের ডান দিকে থাকবে।
এবার বাদিকের সংখ্যার সাথে ১ যোগ করে আমরা পেলাম ১ + ১ = ২ ;
এই ২ আর ১ এর গুন ফল হল ২, যে সংখ্যাটা বাঁ দিকে বসল।
সব মিলিয়ে আমার উত্তর এল ২১৬।

দ্বিতীয় উদাহরণঃ
৬৩ X  ৬৭

এখানে বাঁদিকের খন্ডের সংখ্যা হল ৬ এবং ডান দিকে আছে ৩ এবং ৭  যোগফল ৩ + ৭ = ১০
সুতরাং  নিয়ম অনুসারে ৩ X ৭ = ২১ যাচ্ছে ডান দিকে
এবং  ৬ + ১ = ৭ তাই ৬ X ৭ = ৪২ যাচ্ছে বাঁ দিকে।
উত্তরের সংখ্যাটা দাড়াচ্ছে  ৪২২১।

তৃতীয় উদাহরণঃ
১০২ X  ১০৮

ওখানে বাঁদিকের খন্ড হচ্ছে ১০  আর ডানদিকের  খন্ড হচ্ছে ২ আর ৮ ।
নিয়মানুসারে ২ X ৮ =১৬  আর ১০+১ = ১১ এবং  ১১ X ১০ = ১১০
সুতরাং আমাদের উত্তর হল ১১০১৬।

চতুর্থ উদাহরনঃ
১০২ X  ১৯৮

এখানে বাদিকের সংখ্যা হল ১
এবং ডানদিকের খন্ডে আছে ২ এবং ৯৮ যোগফল ২ + ৯৮ = ১০০
নিয়মানুসারে বাঁ দিকে থাকছে ১ X (১+১) = ২
এবং ডানদিকে থাকছে ২ X ৯৮ =  ১৯৬
যেহেতু ২ + ৯৮ = ১০০  (১ এর পরে দুটি শূন্য)তাই
ডানদিকে আমাদের (২ +২ =৪)টি সংখ্যা বসবে
অতএব ২ থাকছে বাদিকে থাকছে ০১৯৬
আমাদের উত্তরের সংখ্যা হচ্ছে  ২০১৯৬

পঞ্চম উদাহরণঃ
১২৯৯৯৫ X  ১২০০০৫

বাঁ দিকের খন্ডে থাকছে ১২ এবং ডান দিকের খন্ডে থাকছে ৯৯৯৫ এবং
ডান দিকের খন্ডের যোগফল  ৯৯৯৫ + ৫ = ১০০০০ ( দশের পরে চারটি শূন্য)
সুতরাং আমাদের ডানদিকের খন্ডে মোট (৪ + ৪=৮) আটটি সংখ্যা বসবে
৯৯৯৫ X ৫ = ৪৯৯৭৫ অ্যাট সংখ্যা বানিয়ে হল ০০০৪৯৯৭৫
এটি থাকবে ডানদিকে
বাঁ দিকের ১২ +১= ১৩ এবং ১২ X ১৩= ১৫৬
সুতরাং আমাদের উত্তর হল ১৫৬০০০৪৯৯৭৫

আশা করি এবার আমার লেখাটা সহজ হয়েছে।