বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০১৫

নেকড়ে, শেয়াল আর ভেড়ার গল্প (দক্ষিণ আফ্রিকার উপকথা) এক নেকড়ে একদিন তার শিকার থেকে ফেরার সময় সামনে দেখে এক খামার বাড়ি আর সেখানে কিছু ভেড়ারয়ে গেছে। এই নেকড়ে কিন্তু আগে কোনদিন ভেড়া দেখে নি। কাজেই ভেড়ার মোটাসোটা চেহারা দেখে একটু নরম হয়েই তাঁকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, “আজ্ঞে সুপ্রভাত মশাই,আপনি কে হে ভাই। আপনার নামটা কি বলুন না”? ভেড়ার গলার আওয়াজ এমনিতেই একটু বেশি মোটা আর সে তার গম্ভীর গলায় বল্লে, “আমার নাম হচ্ছে ভেড়া। আর তোমার নামটা কি”? কিন্তু এই কথাগুলো জিজ্ঞেস করার সময় ভেড়া তার সামনের পা দুটো বেশ একটু উচু করেই রেখে কথা বলছিল, যাতে মনে হয় এইবার মাথা দিয়ে গুঁতিয়েই দেবে, নেকড়ে এই ভেড়ার গম্ভীর গলার আওয়াজ শুনে বেশ একটু ভয় পেয়ে গেল আর নিজের পরিচয় হিসাবে কোন রকমে “আমি নেকড়ে” এই কথাটুকু বলে পড়ি কি মরি করে পালাল। এখন এই নেকড়ে যে জঙ্গলে থাকত, সেখানে এক শেয়ালও থাকত। হাঁফাতে হাঁফাতে নেকড়ে গিয়ে শেয়ালকে বলে, “ও শেয়াল ভায়া, আজ আমি একটা ভয়ানক ধরনের জানোয়ার কে দেখেছি। কি তার গলার আওয়াজ, আমি তো ভাই, ভয়ের চোটে পালিয়ে এসেছি । নাম জিজ্ঞেস করলাম তো বলে আমি ভেড়া”। শেয়াল বলে, “ভায়া তুমি একটা বুদ্ধু, ভেড়ার মাংস তুমি কি আগে খাওনি। ঠিক আছে, কাল আমরা দুজনে গিয়ে ওটাকে মেরে ভাল ভাবে মাংস খাব”। কিন্তু নেকড়ে যেতে ভয় পাচ্ছে দেখে বলে, “ঠিক আছে একটা দড়ি দিয়ে আমরা একে অন্যের সাথে বাঁধা থাকলে তো আর কেউ কাউকে ছেড়ে পালাবে না”। পরের দিন সকালে যখন ভেড়া তার সকালের জলখাবার খাচ্ছে তখন হটাত দেখে দূরে নেকড়ে আর শেয়াল দুজনে মিলে আসছে। ভেড়া তো ভীষণ ভয় পেল আর তার গিন্নী কে বললে, “গিন্নি আজ মনে হচ্ছে আমাদের শেষ দিন। আমাদের খেতে নেকড়ে আর শেয়াল দুজনে মিলে আসছে”। ভেড়া গিন্নী বলে, “চিন্তার কোন কারণ নেই, আমি সব কিছু ঠিক করছি। তুমি বরঞ্চ এক কাজ কর। আমাদের ছোট বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে একটু বাইরে থেকে ঘুরে হাওয়া খাইয়ে আন। আর হ্যাঁ, আমি তোমাকে ইশারা করলেই তুমি বাচ্চাটার গায়ে খুব জোরে একটা চিমটি কেটে দেবে। যাতে বাচ্চাটা কেঁদে ওঠে”। এদিকে শেয়াল আর বাঘ যখন কাছে এসেছে অমনি ভেড়া গিন্নী ইশারা করতেই ভেড়া তার বাচ্চাটাকে দিয়েছে এক চিমটি। আর বাচ্চাটা কেঁদে উঠেছে। তখন ভেড়াগিন্নী জোরগলায় বলে উঠল, “ঠিক আছে শেয়াল ভায়া। একেবারে ঠিক সময়েই নেকড়েটাকে ধরে এনেছ। দেখনা বাচ্চাটা খাবে বলে কাঁদছে। নিয়ে এস কাছে। বাচ্চাটাকে খেতে দিই”। নেকড়ে এই কথা শুনে ভাবে সত্যি বুঝি শেয়াল তাঁকে ধরে বেঁধে নিয়ে এসেছে ভেড়ার কাছে খেতে দেবে বলে। আর কি সে থাকে ওখানে। প্রাণপনে পেছন দিকে মারল ছুট। আর শেয়াল তো দড়ি দিয়ে নেকড়ের সাথে বাঁধা আছে। সে মাটিতে আছাড় খেয়ে, ঘষটে গায়ের ছালচামড়া ছিঁড়ে, নেকড়ের বাঁধনের সাথে চলল জঙ্গলের দিকে। একেবারে জঙ্গলের ভেতরে না যাওয়া পর্যন্ত নেকড়ে আর থামে নি। ভেড়া, তার গিন্নী আর বাচ্চা বেঁচে গেল।

from Spicydilip http://ift.tt/1wYA6xU

via IFTTT

সোমবার, ২ মার্চ, ২০১৫

কৃতজ্ঞতা (জাপানী রূপকথা) কোন এক সময়ে জাপানের হিতাচীতে নামইকাটা নামে একটা জায়গায় এক পন্ডিতমশাই থাকতেন। বয়স তার ছিল অনেক আর তার কোন ছেলেপিলেও ছিল না যারা তাঁকে খাবার তৈরী করে দেবে। পন্ডিতমশাই তার রান্নাবান্না নিজেই করে নিতেন আর দিন রাত মনদিয়ে প্রার্থনা করতেন, “ নামু আমিদা বুতসু “ মানে হচ্ছে, ওম মনিপদ্মে হুম। কাছের গ্রামের লোকজনেরা তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করত আর শাক সব্জী, কলাটা মুলোটা দিয়ে যেত। এমনকি তার ঘরের মেরামতীর দরকার পড়লে তারাই এসে সেটা করে দিত। এক শীতের রাতে যখন বাইরে খুব ঠান্ডা পড়েছে, তখন পন্ডিতমশাই শুনলেন কে যেন তাঁকে বাইরে ডাকছে, “পন্ডিতমশাই, পন্ডিতমশাই”। উঠে দরজা খুলে দেখেন বেজীর মতন একটা জন্তু দরজাতে দাঁড়িয়ে আছে। নাম তার ছিল ব্যাজার। রাতবিরেতে এই রকম একটা জন্তুকে দরজাতে দেখলে লোকে সাধারনত ভয় পাবে, কিন্তু পন্ডিতমশাই ভয় পেলেন না। বরঞ্চ জিজ্ঞেস করলেন কি চাই তার। ব্যাজার বলে, “প্রভু আমি এতদিন পাহাড়ে থাকতাম কিন্তু এখন বয়স হয়েছে ঠান্ডায় বড্ড কষ্ট পাচ্ছি। আপনি যদি দয়া করে আমাকে আপনার ঘরে একটু জায়গা দেন আর আপনার ঘরের একটু আগুন পোহাতে দেন, তবে আমি একটু গরম থাকতে পারি”। পন্ডিতমশাইয়ের দয়া হল, আহারে বেচারা ঠান্ডায় কষ্ট পাচ্ছে। তাই বললেন, “এটা আর কি এমন কথা। চটপট ঘরে ঢুকে এস, আর আগুনের পাশে বসে যাও”। ব্যাজার ঠিক এই রকম আশা করেনি। তবুও পন্ডিতমশাই বলামাত্র সে ঘরে ঢুকে এল আর আগুনের পাশে বসে গেল। পন্ডিতমশাই দরজা বন্ধ করে লেগে গেলেন আবার প্রার্থনা করতে। ঘন্টা দুয়েক বাদে ব্যাজার যখন বুঝতে পারল যে তার গা বেশ গরম হয়ে গেছে তখন সে পন্ডিতমশাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিল। তার পর থেকে সে রোজই রাতে পন্ডিতমশাইয়ের ঘরে আসতে শুরু করে দিল। আসার সময় ব্যাজার কিছু শুখনো ঘাস পাতা আগুনের জন্য নিয়ে আসত। এটা পন্ডিতমশাইয়ের অভ্যাসে মধ্যে দাঁড়িয়ে গেছিল। যদি কোনদিন ব্যাজারের আসতে দেরী হত তো পন্ডিতমশাই ভাবতে থাকতেন কেন এত দেরী হচ্ছে। শীত চলে গেলে বসন্তকাল এসে পড়ল আর তখন ব্যাজার পন্ডিতমশাইয়ের কাছে আসা বন্ধ করে দিল। কিন্তু আবার ঘুরে শীত পড়তেই ব্যাজার এসে হাজির। আবার সেই আগের মতন ব্যাজার রোজ রাত্রে এসে পন্ডিতমশাইয়ের কাছে থাকে। এভাবে দশ দশটা বছর কেটে গেল। ব্যাজার বলে, “পন্ডিতমশাই আপনার দয়ায় তো আমার শীতগুলোতে কোন কষ্ট হয়নি। কিন্তু আপনার এই উপকারের বদলে আমি কি করতে পারি। আপনি বললে পরে সেটা না হয় আমি চেষ্টা করে দেখব”। পন্ডিতমশাই বলেন, “নারে ভাই, আমার কাছে তুমি বরাবর এই রকম ভাবে প্রতি শীতে আস সেটাই আমার সবচেয়ে ভাল লাগবে”। প্রত্যেক বছরই ব্যাজার পন্ডিতমশাইকে এই ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। শেষে এক দিন পন্ডিতমশাই বললেন, “দেখ ভাই। আমি তো সারাদিন প্রার্থনা করেই কাটাই, আর আমার জন্য প্রত্যেক দিনে যা যা দরকার, তা তো গ্রামের লোকেরাই আমাকে দিয়ে যায়। তাই বিশেষ কিছুর দরকার আছে বলে তো মনে হয় না। হ্যাঁ, তবে তুমি যখন এত কথা বলছ, তখন যদি আমাকে তিন রিয়ো সোনা দিতে পার তবে ভাল হয়। মানে আমি তো বুড়ো হয়েছি, যে কোনদিন মারা যেতে পারি। এখন ঐ তিন রিয়ো সোনা আমি যদি কোন মন্দিরে দান করি, তবে তারা আমার নির্বাণের জন্য ভাল করে প্রার্থনা করবে”। পন্ডিতমশাই যতক্ষণ এই কথাগুলো বলছিলেন ততক্ষণ ব্যাজার কে বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। তাই দেখে পন্ডিতমশাই বললেন, “যাকগে, তোমায় এ নিয়ে চিন্তিত হতে হবে না কেননা নির্বাণের পথে যাচ্ছি যখন, তখন আমার হয়ে কেউ প্রার্থনা করে কি না করে তাতে কিছু এসে যায় না”। কিন্তু তার পরে ব্যাজার আর আসে না। পন্ডিত মশাই ভাবেন কি হল রে বাবা, নিশ্চয় টাকা জোগাড় হয়নি বলে আসছে না, আর নয়ত টাকা জোগাড় করতে গিয়ে কিছু দুর্ঘটনা হয়ে বেচারা মারা গেছে। এই ভাবেন আর নিজের উপরে রাগ করেন যে কেন তার ঐ সোনার কথা বলতে গেলেন। আর বেশী করে ব্যাজারের জন্য প্রার্থনা করতে থাকেন। এই রকম ভাবে তিন তিনটে বছর কেটে গেল। হঠাত এক রাতে পন্ডিত মশাই একটা ডাক শুনতে পেলেন, “গুরুদেব, ও গুরুদেব”। গলার আওয়াজ ব্যাজারের মতো লাগছে মনে হল। আনন্দে পন্ডিত মশাই এক লাফে উঠে দরজা খুলেই দেখেন সত্যি তো ব্যাজার দাঁড়িয়ে আছে। তিনি আনন্দে বলে উঠলেন, “কোথায় ছিলে এত দিন। এদিকে আমি চিন্তায় মরি তোমার কিছু বুঝি হল”। ব্যজার ঘরে ঢুকে বলে, “গুরুদেব, আপনি আমাকে যে সোনার কথা বলেছিলেন সেটা যদি কোন অসৎ কাজের জন্য হত তবে তো আমি যে কোন জায়গা থেকে চুরি করে আনতে পারতাম। কিন্তু যখন আপনি বললেন যে ওটা কোন মন্দিরে দেবেন, তখন আমি ভাবলাম চুরি করে তো কোন মহৎ কাজ হবে না। তাই আমি চলে গেছিলাম সাডো দ্বীপে। সেখানে খনির মজদুরেরা যে সমস্ত মাটী আর বালি খুঁড়ে সোনা নিয়ে বাকিটা ফেলে দ্যায় সেই গুলোকে গালিয়ে তার থেকে কিছু কিছু করে সোনা বার করেছি। সেই জন্যই এত দেরী হয়ে গেল”। এই বলে একটা কাপড়ের পুটুলী খুলে পন্ডিত মশাইকে দেখাল। হ্যাঁ সত্যি তো সোনাই দেখা যাচ্ছে। পন্ডিতমশাই সেটাকে তুলে নিয়ে বললেন, “তাহলে সত্যি তুমি আমার একটা কথার জন্য এত কষ্ট করলে, তোমাকে যে আমি কি বলব তা ভেবে পাচ্ছি না”। ব্যাজার বলে, “গুরুদেব, আমি আমার কর্তব্য করেছি, ওটা তো আমার করা উচিতই ছিল। দয়া করে একথা আপনি আর কাউকে বলবেন না”। পন্ডিত মশাই কথাটা শুনে বললেন, “কিন্তু না বলে তো থাকা যাবে না। কারণ আমার ঘরে এটা রাখলে পরে চোরে চুরি করে নিতে পারে। আর যদি মন্দিরে এখন দিই তবে লোকে ভাববে কোথা থেকে এই পন্ডিত ভিখিরীর এত টাকা হল যে সোনা দান করছে। অবশ্যি আমি বলতে পারি যে আমাকে তুমি দিয়েছ। তাতে একটা বিপদ হতে পারে যে তোমার উপরে লোকে হামলা করবে। তবুও যতদিন আমি বেঁচে আছি, ততদিন তুমি মাঝে মাঝে এসে আমার সাথে দেখা করে যেও”। তার পর থেকে যতদিন পন্ডিতমশাই বেঁচে ছিলেন, ততদিন ব্যাজার প্রতি শীতে তার ঘরে এসে রাত কাটাতেন। কিন্তু তোমরা এর থেকে কি শিখতে পারলে, দেখলে তো একটা জন্তুও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ইচ্ছে আর ক্ষমতা রাখে।

from Spicydilip http://ift.tt/1wYA6xU

via IFTTT

রবিবার, ১ মার্চ, ২০১৫

আমার দেখা সত্তরের দশক (৬)

ইতিমধ্যে আমার আবার ট্রান্সফার হবার সময় এসে গেল। মানে চার বছর এক জায়গাতে রয়ে গেছি আর কি কারুর সহ্য হয়। পাঠান হল আমাকে বিশাখাপত্তনমে বা রেলের ভাষায় ওয়াল্টেয়ারে। সেটা হল ৭৭ সালের মার্চ নাগাদ। গিয়ে দেখি আমার পূর্বসুরী, রেলের চাকরী ছেড়ে বেসরকারী কোম্পানিতে যোগ দিচ্ছেন, আমাকে তার জায়গা নিতে হবে। কাজ হচ্ছে লোহার আকর জাপানে রপ্তানী করার জন্য যে কোত্তাভালাসা-কিরুন্ডুল লাইন তৈরী হয়েছিল সেটার বৈদ্যুতিকরণ।

এই লাইনটার একটা বিশেষত্ব ছিল। পুর্বঘাট পর্বতমালা (অনন্তগিরি রেঞ্জ) পার হয়ে এটা উড়িষ্যার ভেতর দিয়ে মধ্যপ্রদেশের বাস্তার (বর্তমানে ছত্তিশগড়ে) এলাকায় কিরুন্দুলের বৈলাডিলা পাহাড়ের লৌহআকর রপ্তানীর জন্য তৈরী করা হয়েছিল। সাধারণত পাহাড়ী এলাকাতে রেলের লাইন পাতার কাজে ছোট গেজ (ন্যারো) এর প্রয়োগ করা হয়, কিন্তু এখানে বড় সাধারণ (ব্রড) গেজের ব্যবহার করা হয়েছিল কারণ এক সাথে অনেক মাল বহন করা যাবে।

ওয়াল্টেয়ার আর ভিজিয়ানাগ্রামের মাঝামাঝি জায়গা কোত্তাভালাসা থেকে এই লাইনটা পাহাড়ের দিকে ঘুরে গেছে। আর কিছুটা যাবার পরেই আসে শৃঙ্গভরপুকোটা বা রেলের ভাষায় এস কোটা। এখান থেকে আরাকূ পর্যন্ত পাহাড়ী রাস্তা, তার পরে কোরাপুট পর্যন্ত প্রায় সমান জমি। কোরাপুট পার হবার পরে অল্প কিছুটা পাহাড় বেয়ে লাইন নীচে নেমেছে তার পরে মধ্যপ্রদেশের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে জগদলপুর হয়ে দান্তেওয়ারা হয়ে কিরিন্দুল পৌঁছেছে।

আরাকু আসার আগেই রাস্তায় পড়ে বোড়াগুহালু ষ্টেশন। একটু দূরে বোড়া গুহা। এক বিরাট গুহা যাতে উপর থেকে জল চুইয়ে পড়ে চূনাপাথরের স্তম্ভ সৃষ্টি করেছে, নাম বৈজ্ঞানিকদের ভাষায় ষ্ট্যালাকটাইট আর ষ্ট্যালাগমাইট। লোকে শিবলিঙ্গ ভেবে পূজোআচ্চাও করে। পরে পড়বে মাচকুন্ডের বাঁধ, আর তার কাছেই কিছু পুর্ব বাংলার বাস্তুহারাদের কলোনি, কোরাপুটের কাছে সুনাবেড়াতে হিন্দুস্তান এরোনটিক্সের কারখানা। কোরাপুট পার হবার পরে বড় জায়গা আসে জগদলপুর।

জগদলপুরের আগে আসে মালিগুড়া রেঞ্জ ফরেষ্ট। সন্ধ্যের পরে যদি রাস্তা ধরে গাড়ীতে এই জঙ্গল পার হওয়া যায় তবে বাঘ দেখার সম্ভাবনা আছে। আমি বাঘ দেখতে পাই নি কিন্তু নীলগাইকে কিছু হিংস্র জন্তু তাড়া করায় সে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে রাস্তা পার হচ্ছে দেখেছি। রেলের লাইনের আশপাশে তো ভাল্লুকের আনাগোনা লেগেই থাকত। আমি নিজেও ভাল্লুক দেখছি। জগদলপুর পার হবার পরে আসে গিদাম, দান্তেওয়ারা যেখানে সেই অবুঝমারের জঙ্গলের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এখানে রেলের লোকেরা রাত লাইনে কোন কাজে  (যেমন সিগনালে আলো লাগানো) জানোয়ারের আক্রমণের ভয়ে যেতে চাইত না। বলা হয় এ জায়গা এখন মাওবাদীদের আস্তানা।

যদিও লাইনটা কিরিন্দুল পর্যন্ত গেছে লৌহ আকরের জন্য তবুও এই আকর পাওয়া যেত বাচেলী আর কিরিন্দুলের মাঝ থেকেই। বড় বড় রোটারী এক্সকাভেটর দিয়ে পাথর কাটা হচ্ছে আর তার পর তাকে নদীর জলে ধুয়ে মাটী সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। নদীর জল এই ময়লা নিয়ে লাল হয়ে গেছে, মাছ আর পাওয়া যায় না, কিন্তু তার কোন খেয়াল নেই। বৈদেশিক মুদ্রা রোজগার হচ্ছেত। এই প্রসঙ্গে বলি, আজকাল জাপানে আর আকর রপ্তানী হয় না। সমস্ত আকর ভিশাখাপত্তনমে যে ইস্পাত কারখানা হয়েছে তাতে ব্যবহার করা হয়।

সাধারণত ব্রড গেজের লাইনের ঢাল (গ্রেডিয়েন্ট) প্রতি ১০০ ফুটে ১ ফিটের চেয়ে বেশি করা হয় না, এখানে প্রতি ৪০ ফিটে ১ ফিট ঢালে লাইন পাতা হয়েছে, যার ফলে  ৪০/৪২টা ৯০ টন আকর ভর্তি করার ক্ষমতার খালি ওয়াগনকে টানতে তিনটে ইঞ্জিন কোন রকমে পেরে উঠত। আর যখন মাল ভর্তি করে নামত, তখন ওয়াগনগুলো ঢালের মুখে পড়ে গতি পেলে ঐ তিনটে ইঞ্জিন লাগত তাদের টেনে ব্রেক করে রাখার জন্য।

লাইনে বাঁক ছিল অসংখ্য আর টানেল ছিল মনে হচ্ছে  ছিল ৫৮ টা। এই রকম ইঞ্জিনিয়ারিঙের একটা নিদর্শনে দুর্ঘটনাও হত আকচার। তা ছাড়া পুর্বঘাট পর্বতমালার পাহাড়ে বঙ্গোপসাগরের ঘুর্ণিঝড় প্রায়ই প্রচুর বৃষ্টিপাত করে ধ্বস নামিয়ে দিত, যার ফলে বর্ষাকালে ট্রেন চলাচল অনিয়মিত থাকত।

রেলের একটা নিয়ম আছে য্ত।কোন লাইন যদি ১০০০ মিটার পার করে, তবে তার পরের অংশটাতে যে সমস্ত কর্মচারী কাজ করেন তাঁদের পাহাড়ী ভাতা দিতে হয়। রাস্তায় কিছুদূর যাবার পরে একটা ষ্টেশন আসে শিমিলিগুডা। দেখা গেল লাইনের উচ্চতা হয়ে যাচ্ছে ১০০৪ মিটার।  এই ষ্টেশনের পরে লাইনটা কিন্তু নীচের দিকে নেমে গেছে এবং আগে কোথাও আর ১০০০ মিটারের উচ্চতা পার হয়নি। কিন্তু এই শিমিলিগুডা থেকে যেতে হবে আরও প্রায় ৩৫০ কিলোমিটারের মত।

তবে কি সেই সমস্ত ষ্টেশনের কর্মচারীদের ঐ পাহাড়ী ভাতা দিতে হবে। উপায় একটাই। ঐ শিমিলিগুডা ষ্টেশনের সমস্তটা আর দুপাশে আরও এক কিলোমিটারের মতন জায়গাতে পাহাড় কেটে ১০০০ মিটারের নীচে নামিয়ে আনা হল। ষ্টেশনের বাকী সব জায়গা, যেমন ষ্টেশন বিল্ডিং, ষ্টাফ কোয়ার্টার সব ১০০০ মিটারের বেশী উচুতে। কিন্তু যেহেতু লাইন আছে ৯৯৬ দশমিক কিছু মিটারে, তাই আর ভাতা দেবার দরকার পড়ল না।

আমার আইনত অফিস হল আরাকুতে, মানে ওয়াল্টেয়ার থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে, কিন্তু যেহেতু সমস্ত সমন্বয়ের কাজ ওয়াল্টেয়ারে, তাই আমার অফিসের নাম হল আরাকু এট ওয়াল্টেয়ার, মানে আমি ওয়াল্টেয়ারে থাকব কিন্তু প্রায় একদিন বাদে বাদেই আমাকে লাইনে যেতে হবে। অসুবিধার মধ্যে যাতায়াতের জন্য প্যাসেঞ্জার ট্রেন ছিল দিনে একটি। সকালে ওয়াল্টেয়ার ছাড়ে, আরাকু পৌছতে লাগে পাঁচ থেকে ছ ঘন্টা আর ফেরার ট্রেন আরাকুতে রাত দুটোর সময়। সকাল আটটার পরে এসে ওয়াল্টেয়ারে পৌছবে।

আরাকু জায়গাটা অদ্ভুত, সারা দিনে তিনটে ঋতুকে উপভোগ করা যেতে পারে, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ভ্যাপ্সা গরম, প্রায় গ্রীষ্ম কাল, বিকেলের দিকে বৃষ্টিতে বর্ষাকালের আনন্দ আর রাত পড়লেই ঠান্ডা, শীতকালের মত। সারা বছর রাতে গরম জামা পড়ে থাকতে হবে। আমার হল মুশকিল, ওয়াল্টেয়ার থেকে যখন বার হই তখন ওখানে বেশ গরম থাকে। অবশ্যি ওয়াল্টেয়ার সমূদ্রের ধারে হবার জন্য একমাত্র বর্ষাকালেই একটু ঠান্ডা বোধ হয়, নইলে বাকী সব সময় গরম। স্নান করে গা মোছা শেষ হতে না হতেই আবার মুছতে হয়, তবে এবার জল নয়, ঘাম।

লোকেদের কথ্য ভাষা তেলেগু। এর আগে শুনিইনি। বাসে নম্বর রোমান অক্ষরে কিন্তু গন্তব্যস্থল তেলেগু ভাষায় লেখা। বাসে কন্ডাক্টরের ভাষা তেলেগু। দোকানে কিছু জিনিষ কিনতে গেলে বিপদ, কি করে জিনিষের নাম বোঝাব? উপায় একটাই স্যাম্পল হাতে নিয়ে বাজারে যাওয়া। কিন্তু সব্জী কেনার বিপদ অনেক,  কায়লু আর পান্ডুর মধ্যে তফাৎ (মানে কাঁচা আর পাকা) বোঝাতে হবে। তবে বাজারে গেলে যেহেতু সব্জী চিনি, তাই কেনার সময় নামটা শুনে মুখস্থ করতে হত। মাছ কেনার সময় বিপদ ছিল, কেননা চপ্পল হল চপলু আর মাছ হল চ্যাপলু। দোকানীকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে কথাটা বলার চেষ্টা করা হত।

পাহাড়ী এলাকা কাঠাল গাছে ভর্তি ছিল, তবুও সাধারণ লোকে এঁচোড় (ওদিকের ভাষাতে পনসকায়) খেতে জানত না। মানে আমাদের মত গাছ পাঁঠা তৈরী করে খাওয়ার মেথডে। ওদের এঁচোড় খাবার মেথড ছিল খোসা বাদ দেবার পরে একেবারে সব শুদ্ধ কুচিকুচি করে কেটে রান্না করা। কলাগাছ থাকলেও থোড় বা মোচা, খাবার হিসাবে গণ্য হত না। আমার সহকর্মী, যে এস কোটাতে থাকত তার কাছে বলা ছিল যে কাঁচাকলার গাছ না হলে থোড় আর মোচা আমাকে পাঠাতে। মাসে এই রকম বার দুয়েক সাপ্লাই এসে যেত। লাউ খাওয়া হবে কিন্তু লাউডগা তো গরুর খাদ্য। 

ভাষা বিভ্রাটের আর একটা উদাহরণ দিচ্ছি। একবার আমার এক খালাসীকে বলেছি বস্তা করে গুল (মানে গুড়ো কয়লার ব্রিকেট, তখনও ওয়াল্টেয়ারে গ্যাসের সাপ্লাই চালু হয়নি) নিয়ে আসতে। এখন বোড়া হিন্দি মানে বস্তা,  কিন্তু তেলেগুতে বোড়া মানে মাথা বা বড়টা। গুল বদলে গেছে তার কাছে গুডলুতে মানে ডিমে। লোকটা অবাক, মাথা ভর্তি ডিম আনতে বলে কেন?

চিন্তা করতে হবে যে আমার অফিসে তখন প্রায় শ চারেকের মত লোক, ফিটার থেকে খালাসী মিলিয়ে ছিল আর তার মধ্যে অন্য ভাষাভাষী কেউ নেই। দোভাষির কাজে আমার দুই সহকারী তেলেগু ষ্টাফ, যারা খড়গপুরে বছর ছয়েক কাটিয়েছে। এরা দুজনে যদিও আরাকুতে থাকত, আর এত সুন্দর বাংলা বলত যে আমার কেন আমার এবং আমার ফ্যামিলির কারুর অসুবিধা হত না।

কিন্তু আমাকে এর রাস্তা খুঁজে বার করতে হল। প্রথমে সিনেমার পোষ্টার দেখে অক্ষর চেনা। তার পরে পেদ্দা শিক্ষা মানে বড়দের জন্য শিক্ষা বইটা জোগাড় করে পড়া, আর লোকেদের হুকুম দেওয়া যে আমাকে তারা তেলেগু ছাড়া অন্য কিছু (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজও  না) বোঝানর জন্য ব্যবহার করবে না। ফল দিল। আমি তেলেগু বই পড়তে শিখে গেলাম আর কথাও বলতে। আজ অবশ্যি বছর ত্রিশ পয়ত্রিশ বাদে চর্চার অভাবে পড়তে পারিনা, কিন্তু ভাঙ্গা ভাঙ্গা বলতে পারি।


এই লাইনটা তৈরী করার সময় প্রজেক্টটা ছিল ডি বি কে (দন্ডকারণ্য, বোলাঙ্গীর কিরিবুরু) প্রজেক্ট নামে। ষ্টাফেদের জন্য একটা কলোনীও তৈরী ছিল। বাড়ীগুলো তৈরী ছিল পাথর দিয়ে, যাকে ইঞ্জিনিয়ারিং ভাষায় বলা হয় র‍্যান্ডম রাবল ম্যাসনারী। ছাদ থেকে জল চুইয়ে আসার সম্ভাবনা খুব থেকে যায়। প্রথমে আমার আস্তানা পাওয়া গেল এই রকম এক কোয়ার্টারে। আমি বিলাসপুর গিয়ে মালপত্র বুক করে এলাম আর বিশেষ খেয়াল রাখা হল যাতে ওয়াগন এসে পৌছয় তিন সাতেকের মধ্যে। মালপত্র পৌছলে তবে ফ্যামিলী নিয়ে আসা হবে। এবার আর মালপত্র এসে পৌঁছতে দেরি হয়নি।

আন তিয়েমের তরমুজ (ভিয়েতনামের রূপকথা) অনেক দিন আগে ভিয়েতনামে হুং ভং নামে এক দয়ালু রাজা ছিলেন। তার একটাও ছেলে ছিল না। খালি একটাই মেয়ে। কি আর করে, ঠিক করে নিল যে একজন ছেলেকে দত্তক নেবে। দূরদেশ থেকে এক ছেলেকে সে দত্তক নিল। ছেলের নাম ছিল আন তিয়েম। ধীরে ধীরে আন তিয়েম বড় হয় আর সব দিক দিয়ে চৌখস ছেলে হয়ে ওঠে। যেমন বুদ্ধি তেমনি তার বিচার। রাজা মশাই খুব খুশী। কিন্তু তার মেয়েকেও তিনি কাছছাড়া করতে রাজী নন, তাই ঠিক করলেন যে আন তিয়েমের সাথে তার নিজের যে মেয়ে ছিল তার বিয়ে দিয়ে দেবেন। রাজামশাই চেয়েছেন আর বিয়ে হবে না? বিয়ে মহা ধুমধামের সাথে হয়ে গেল, আর তার পরে দুজনে মহা সুখেই দিন কাঁটাতে লাগল। কিন্তু রাজসভাতে কিছু না কিছু বদ লোক থাকবেই। তারা এই দুজনের নামে মিথ্যে মিথ্যে গুজব রটাতে শুরু করে দিল। কেননা তারাতো আর এঁদের ভাল চায় না। ক্রমে রাজামশাই এই সব গুজব শুনতে পেলেন। ভাবতে থাকেন তবে কি এগুলো সত্যি। তার মেয়েই তার বিরুদ্ধে যেতে চাইছে। আর আন তিয়েম, যাকে তিনি নিজের ছেলের মতন করে ভালবেসে ছিলেন সেও ঐ দলে আছে। বিশ্বাস হচ্ছেনা, কিন্তু তবু হলেও হতে পারে। তাহলে কি করা যায়। ঠিক করলেন আন তিয়েমকে নির্বাসন দেওয়া হোক। কোথায়, না বহুদূরের কোন এক নির্জন দ্বীপে। কবে যে নির্বাসনের সাজা মকুব হবে তা কজেউ জানে না।আন তিয়েমও কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না যে সে কোনদিন বেঁচে ফিরতে পারবে। আর ওদিকে আন তিয়েমের স্ত্রী মানে রাজামশাইয়ের মেয়ে যখন দ্বীপে গিয়ে সেই হুহু করে বয়ে যাওয়া ঝোড়ো হাওয়া দেখল আর তার ঝাপটা গায়ে অনুভব করল, সে তো কেঁদেই ফেলল। কি করে এই রকম জায়গাতে তারা থাকবে। কোন লোকজন নেই সাহায্য করার মতন কাউকে কোথাও পাওয়া যাবে না। ভেবে কি লাভ, যাকগে কি আর করা যাবে। কোন রকমে তার নিজেদের ধীরে ধীরে ওখানে থাকার জন্য তৈরী করে নিতে শুরু করল। একদিন আন তিয়েন সমূদ্রের পাড়ে দেখে কয়েকটা হলুদ রঙের পাখী ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাখীগুলোকে সে চেনে না, তাই ভাল করে দেখবার জন্য সে একটা উচু পাথরের উপর থেকে নজর রাখতে লাগল। দেখতে পেল যে কিছু কাল রঙের বিচি ওখানে পড়ে আছে আর পাখীগুলো তাতে ঠোকর মারছে আর খেয়ে নিচ্ছে। আন তিয়েম ঠিক করে নিল এই বীজগুলো নিয়ে সে কোথাও পুঁতে দেবে। তাতে তার তো ক্ষতি তো কিছু হবে না। আন তিয়েম তার বউকে বলল, “দেখ এই বিচীগুলো পাখী খাচ্ছিল। তারা যদি খেতে পারে তবে এর ফল আমরাও খেতে পারব”। পুঁতে দেবার কিছুদিন বাদেই দেখল যে বীজগুলো থেকে লতার মত গাছ হয়েছে, তাতে প্রথমে কুড়ি এল তার পরে ফুলও এল। আর সব শেষ এল ফল। গোল গোল ফল ক্রমে বড় হয়। দেখতে দেখতে সেই ফলগুলো তাঁদের মাথার মাপের চেয়ে বড় হয়ে উঠল, সবুজ রঙের গা, বেশ হাত বোলালে মসৃণ লাগে। ফলগুলোর থেকে সুন্দর গন্ধ বার হচ্ছে দেখে একদিন আন তিয়েম একটা ফল কেটে নিয়ে খাবার জন্য বাইরের খোলাটা ছাড়াল। ভেতরে লাল রঙ। আর কি মিষ্টি খেতে । ফলটার নাম আন তিয়েম দিল “দুয়া দু”। কিন্তু আন তিয়েমের বৌ বলে, শোন শোন পাখীগুলো কি বলছে। আন তিয়েম পাখীর ডাক শুনে বলল, ওরা তো বলছে “তে কুয়া, তে কুয়া”। দুজনে মিলে ফল গুলোকে খতে লাগল কিন্তু ফলের বীজ গুলোকে তুলে রাখল যাতে নষ্ট না হয়। এই প্রথম তারা ‘তে কুয়া’ মানে তরমুজ খেল। পরের বছর সেই বীজগুলো পুতে আরও তরমুজ হল, এমন করে প্রচুর তরমুজ হলে পরে, আন তিয়েম বুদ্ধি করে দ্বীপের কাছ দিয়ে যে সমস্ত জাহাজ যেত, তাদের নাবিকদের কাছে ঐ তরমুজ বিক্রী করে তার বদলে তাঁদের যা যা দরকার তাই নিতে লাগল। তাঁদের আর কোন কষ্ট রইল না। একদিন আন তিয়েমের মাথায় একটা বুদ্ধি আচমকা এল। সে কিছু তরমুজের গায়ে তার নাম খোদাই করা সমূদ্রের জলে ভাসিয়ে দিল। তরমুজগুলো ভাসতে ভাসতে গিয়ে পৌছল রাজা মশাইয়ের দেশে। সেখান কার লোকেরা নতুন ধরণে কিছু সমূদ্রে ভাসছে দেখে তুলে নিয়ে এসে রাজামশাইয়ের কাছে হাজির। রাজামশাই দেখলেন ফলের গায়ে লেখা আছে আন তিয়েম। রাজামশাই চেচিয়ে উঠলেন আরে এটাতে তো আন তিয়েমের নাম লেখা আছে। তাহলে আন তিয়েম এখনো বেচে আছে। লোক পাঠিয়ে আন তিয়েমকে আর তার বউকে দেশে ফেরত নিয়ে আসা হল। সবাই সুখে থাকতে লাগল।

from Spicydilip http://ift.tt/1wYA6xU

via IFTTT

শুক্রবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০১৫

আমার দেখা সত্তরের দশক (৫)

নতুন শখ হল মুরগী পোষা যায় কিনা। দুটো মুরগী এনে তাদের কেটে খাওয়ার বদলে ভেতরের উঠোনে কয়লা রাখার জায়গাতে রেখে দেওয়া হল। তখন গ্যাস আর কোথায়। কয়লা মানে কোল ব্রিকেটস। মুরগী দুটো খায় দায় আর পেছনের বাড়িতে গিয়ে ডিম পেরে আসে। কদিন দেখার পরে আমার বাড়িতে যে অল্প বয়সী বউটি কাজ করত সে বলে,  ওটাতো ঐ বাড়িতে গিয়ে ডিম পেরে আসছে।

তারপর থেকে কদিন একটু আটকে রাখার পরে রোজ একটা করে ডিম পাওয়া যেত। তখন মেয়ের মাথা চুলের জন্য নেড়া করে দেওয়া হয়েছিল, আর তার পরে মাথায় ডিম মাখালে চুল ভাল হবে অতএব ওর মাথায় একটা করে ডিম ঠুকে ফাটান হত। আর তাতে ওর দাদাদের কি উল্লাস। এখনও মেয়ে আমাকে বলে, আমার মাথায় তুমি যে ডিমগুলো ফাটিয়েছ তার দৌলতেই আমার চুল এত বড় হয়েছিল।

বাডীতে কাজ করতে আসত প্রথম প্রথম এক বছর পঞ্চাশেক বয়সের উড়িয়া মহিলা। সাথে তার ছেলের বৌ। পরে তার ছেলের বৌ একাই কাজ করতে আসত। বউটির বিয়ে হয়েছিল বছর দুয়েক আগে, কিন্তু তখনও তার কোন সন্তান হয়নি বলে তার শ্বাশুড়ি আবার ছেলের বিয়ে দেবে বলে ঠিক করছিল। বৌ, নাম ছিল প্রমীলা, এসে তার মাজি অর্থাৎ আমার স্ত্রীকে নালিশ করাতে, সে শ্বাশুড়ী কে ডেকে বোঝায়।

আমার অফিস কাছেই হলেও পরে সেটা তুলে নিয়ে বড় অফিসের পাশে পাঠান হল। সে সমস্ত বিল্ডিং তৈরী করা হয়েছিল তাঁদের মধ্যে একটা ব্লক রেলের স্কুলের প্রাইমারী সেকশনকে দেওয়া হল। আর একটা ব্লকে এসে গেল স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া। মেয়ে কেজি সেকশনে এসে এই প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হল।

কিন্তু সে তখন জানে যে তার বাবা রেলের ফোরম্যান, এর পরেই ফাইভম্যান হবে,  (তার হিসাবে ফোরের পরে ফাইভ, অতএব ফোরম্যান থেকে প্রমোশন পেলে ফাইভম্যান হয়ে যাবে), অতএব টীচার একবার তাকে বকাতে সোজা এসে আমার অফিসে হাজির, আমাকে নালিশ করবে।

কিন্তু আমাকে না পেয়ে আমার অফিসের চৌকিদার বুড়োকে বলেছে। মুন্নিকে কে বকেছে কার ঘাড়ে কটা মাথা, অতএব চৌকিদার তার লাঠি ঠুকতে ঠুকতে গিয়ে হেড মিস্ট্রেসের কাছে হাজির। এর একটা বিহিত করতে হবে। মুন্নিকে বকা চলবে না। আমি ফিরে এসে সব সামাল দিই।

বিলাসপুরে তখন বাঙ্গালী কর্মচারীর সংখ্যা প্রচুর। তিনটে দূর্গা পূজা হত শুধু রেলের কলোনীতে, তা  ছাড়া সিভিল সেটেলমেন্টে আরও গোটা তিনেক।  কোয়ার্টারের কাছেই ছিল কনষ্ট্রাকশন কলোনীর পুজা, যেখানে সারা দিন কেটে যেত। আমাকে অফিসে যেতে হত কিন্তু বাড়ীর বাকী লোকে ঐ প্যান্ডেলে সারা দিন পড়ে থাকত। মধ্যে একবার এসে সন্ধ্যের আরতির আগে কাপড় বদল করে আবার যাওয়া।

এই সময় আমাকে একটু অফিস সংক্রান্ত সোশাল কাজ করতে হল। মানে আমার এক সহকর্মী হঠাত হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। তিনি থাকতেন বিলাসপুরে একা, স্ত্রী কন্যা থাকতেন কলকাতায়। বেশ কিছু দিন হাসপাতালে থেকে পরে ছাড়া পেলেন। অফিস থেকে তার কলকাতায় মেডিকাল রেফারেন্সের বন্দোবস্ত করা হলে তাঁকে কলকাতায় পোঁছানর দায়ীত্ব পড়ল আমার উপরে।

ইতিমধ্যে তার স্ত্রী এবং কন্যা বিলাসপুরে এসে হাজির। এই তিনজনকে নিয়ে আমি একটা ফোরবার্থ কম্পার্টমেন্টে রিজার্ভেশন করে, নিয়ে গেলাম কলকাতায়। কেশব সেন ষ্ট্রীটের বাড়িতে পৌছিয়ে দিয়ে আমার ছুটি। পরে অবশ্যি তার ট্রান্সফার কলকাতায় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
    
রায়পুরের কাজ ভালভাবে শেষ করার জন্য যদিও আমার নামে একটা অ্যাওয়ার্ড এল, তবুও আমাদের মতন অস্থায়ী কর্মচারীদের উপরে ক্রমশই খাড়া নামার ভয় বাড়ছিল। তাই আমার রায়পুরে থাকার সময়েই আমরা ৭১ জন মিলে কলকাতা হাইকোর্টে রেলের বিরুদ্ধে মামলা করলাম। আমাদের স্থায়ীত্ব দিতে হবে এবং এই যে কবছরের কাজের অভিজ্ঞতা হয়েছে, তার মূল্য দিতে হবে।  যুক্তি রইল যদি আমরা কোন জিনিষ গড়তে পারি তবে সেটাকে ঠিক রাখার জন্য সমস্ত কর্তব্যও আমরা করতে পারি। আমাদের হয়ে ব্যারিষ্টার দাঁড়ালেন স্নেহাংশু আচার্য আর রেলের পক্ষে শঙ্করদাস ব্যানার্জী।

কেসের কাজকর্ম দেখার জন্য এক একজনকে মাঝে মাঝে কলকাতায় আসতে হয়। কেস চলতে থাকল। শেষে হাইকোর্ট থেকে রায় বার হল আমাদের বিরুদ্ধে। বিচারকের মন্তব্য ছিল, যদিও আমাদের দাবীটা যৌক্তিক, তবুও বর্তমানে রেলের কোন আইনের দ্বারা আমাদের দাবীকে আইনানুগ করে নেওয়া যাচ্ছে না। সাথে আরও বলা হল রেল যেন এই দাবীগুলোকে সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করে।

এই নিয়ে যখন আমরা সাংসদদের সাথে দেখা করেছিলাম, তখম এক বামপন্থী সাংসদের বক্তব্য ছিল অদ্ভূত। তিনি সোজা বলে দিলেন, তোমাদের ৭১ জনের  দাবীর জন্য তো আমি আমার এত বড় রেলের অন্যান্য কর্মচারীদের ভাসিয়ে দিতে পারিনা।

তার প্রধান যুক্তি ছিল যদি আমাদের অভিজ্ঞতাকে দাম দেওয়া হয় তবে আমাদের এই সমস্ত প্রোমোশনগুলোকেও মান্যতা দিতে হবে আর তাতে ওনার ইউনিয়নের সদস্য, যারা সুযোগের অভাবে এত দিন প্রমোশন পান নি বা কাজের খাতিরে যাদের এই ধরণের কাজ করতে পাঠানো হয়নি, তাঁরা বঞ্চিত হবেন।

আমরা ডিভিশন বেঞ্চে আপীল করলাম। ইতিমধ্যে এলাহাবাদ কোর্টেও একই ধরনের এক মামলাতে রেলের বিপক্ষে রায় গেল। রেল ওখানে আপীল করল। কলকাতা হাইকোর্টে বোর্ড থেকে একজন এসে সওয়াল করার সময় বিচারককে বললেন, এলাহাবাদে এই ধরনের একটা কেস আছে। তাতে যা রায় হবে সেটা আমরা দুই মামলাতেই মেনে নেব। বিচারক রাজী হয়ে আমাদের আপীল ডিসমিস করে রায় সেই ভাবেই দিলেন। কিন্তু এখানেই রেলের আইনজ্ঞদের বুদ্ধির তারিফ করতে হয়।

আমাদের চাকুরীর মেয়াদ তখন থাকছে আর খুব বেশি হলে বছর পঁচিশ। ততদিন যদি এলাহাবাদের মামলাতে তারিখের পর তারিখ নিয়ে নেওয়া যায় তবে কতদূর পর্যন্ত এই সব বালখিল্যেরা লড়তে পারবে। যতদুর জানি এখনও সে কেসের রায় বার হয়নি। তাছাড়া বোর্ডের প্রতিনিধি আমাদের এমন ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন, আমরা যে এই লাখ লাখ টাকা  খরচ করছি, সেটা বোর্ডে দিলেই সব হয়ে যেত। কালো টাকার কারবার সব সময়েই ছিল আর থাকবেও। প্রথম প্রথম যারা অন্য বিভাগ থেকে ডেপুটেশনে এসেছিলেন তাঁদের ফেরত পাঠান হতে লাগল। তাঁদের পরে আমাদের কিছু কিছু লোকেদের অস্থায়ী হিসাবেই  এলাহাবাদ বা ওয়ালটেয়ার এলাকায় পাঠান হতে লাগল।

শেষের দিকে এমন অবস্থা হল যে সারা অফিসে (ইলেক্ট্রিল্কাল সেকশনে) আমি একমাত্র সিনিয়র সুপারভাইসরি ষ্টাফ। আমার অধীনে একজন সুপারভাইজর আর কিছু খালাসি। যদি কোথাও কিছু দরকার পরে তবে সেই কাজটুকু করানর জন্য। মূলত কাজগুলো ছিল বড় আজব ধরনের।

তবে এই সময়ের একটা মজার কথা না বলে পারছিনা। ভিলাই রেলের বৈদ্যুতিক ইঞ্জিন মেরামতীর কারখানাতে একটা নতুন মেশিন বসবে, পিট হুইল লেদ। ইঞ্জিনের চাকার উপরে যে ষ্টীলের টায়ার লাগানো থেকে তাকে কেটে আবার গোল করে দেয়ার কাজের জন্য। যেহেতু চাকাটা খোলা হবে না তাই মেশিন বসাতে হবে লাইনের নীচে, মাটী খুঁড়ে। কাজ শুরু করা আগে তো কন্ট্রাক্টর তার পুজাআচ্চা করে নিয়েছিল। কিন্তু শেষ হবার পরে মেশিনের কাজের উদ্বোধন করার জন্য শুভদিন দেখতে হবে। ধারেকাছে পাজি অনুযায়ী কোন শুভদিন না পাওয়াতে স্থির হল যে প্রাচীন প্রবাদ মঙ্গলে ঊষা, বুধে পা, যথা ইচ্ছা তথা যা। অতএব এক বুধবার দেখে মেশিনের কাজের উদ্বোধন করা হল, আমরা ইতরজন মিষ্টান্ন ভক্ষণ করলাম।

 

সোমবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০১৫

আমার দেখা সত্তরের দশক (৪)



এইখানে একটা কথা বলে নেওয়া ভাল হবে। দেশ স্বাধীন হবার পরে সমস্ত রেল ব্যবস্থাটাকে উত্তর, দক্ষিণ, মধ্য এই রকম কয়েকটা অঞ্চলে ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল, আর প্রত্যেক ভাগের জন্য একজন কর্তা (জেনারাল ম্যানেজার) এর উপরে কাজ চালানর ভার দেওয়া হয়েছিল। বৈদ্যুতিকরণের কাজের ভার, যদিও এই সমস্ত রেলের অঞ্চলগুলিতে হচ্ছিল তবুও এক আলাদা জেনারাল ম্যানেজারের উপরে দেওয়া হয়েছিল। তার মানে দাড়িয়েছিল এক অস্থায়ী নতুন অঞ্চল তৈরী করা হল।

তাঁর মূল কারণ ছিল এর আগে রেলে বিদ্যুতের কাজ কর্ম খুব কম। যেমন সমস্ত হাওড়া-নাগপুর-ওয়াল্টেয়ার এলাকার জন্য মাত্র একজন বিদ্যুৎ অভিযন্তা (ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ার) ছিলেন। সেখানে বর্তমান এই বিরাট যজ্ঞের জন্য অনেক ইঞ্জিনিয়ারের দরকার পড়েছিল। ক্লার্ক, আর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের জন্য বিভাগীয় রেলের লোকেদের ডেপুটেশনে নেওয়া হলেও বিদ্যুৎ বিভাগের জন্য নতুন লোকের দরকার পড়েছিল আর সেই লোক হলাম আমরা। সদ্য সদ্য কলেজ থেকে পাশ করে কাজে যোগ দিয়েছিলাম। আর কি উৎসাহ ছিল কাজে।

৭১/৭২ সাল নাগাদ রেলের দিল্লী অফিসে দুই দলের টানাপড়েন চলছিল। এক দল বলেন বৈদ্যুতিকরণ করা হোক, আর এক দলের মত হচ্ছে তাতে প্রাথমিক খরচ অনেক হবে তাই আমরা কয়লার বদলে ডিজেল দিয়েই গাড়ী চালাব। ডিজেলওয়ালাদের বাড়বাড়ন্ত তখন, যদিও ডিজেল মানেই আমেরিকার দ্বারস্থ হওয়া।  বৈদ্যুতিকরণের জেনারাল ম্যানেজারের পদ বিলুপ্ত করা হল। যেখানে যত বৈদ্যুতিকরণের মালপত্র ছিল সেগুলো বাতিল করে গুদামে পাঠান চালু হল। আর গুদাম থেকে তাদের কাবাড়িওয়ালার দরে বেচে দেওয়া হতে লাগল। যেহেতু ভবিষ্যতে আর বৈদ্যুতিকরণের কাজ আর হবে না, তাই আগামী দিনের মালের বরাত সব বাতিল করা হতে লাগল।

পরে এই মালের অভাবই জাপানে লোহার আকর রপ্তানীর জন্য তৈরী কে কে লাইন বৈদ্যুতিকরণ করতে পাঁচ বছরের মত অতিরিক্ত সময় লাগিয়েছে। এতদিন এটা গর্বের বিষয় ছিল যে কোন বৈদ্যুতিকরণ প্রজেক্ট তার নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশী সময় নেয় নি। রাউরকেলা- দূর্গ লাইনের কাজের সমাপ্তিও  নির্ধারিত দিনের এক দিন আগে হয়েছিল বলে আমরা সবাই আনন্দ করেছিলাম।

যাকগে, রেলের দিল্লী অফিসের সুমতি কিছুদিন বাদেই হওয়াতে আজও এই কাজ হয়ে চলেছে আর সারা ভারতে এখন খুব অল্প জায়গা বাকী আছে ( ট্রাঙ্ক লাইন বা প্রধান পথ) যেখানে বৈদ্যুতিকরণ হয় নি বা এখনও প্ল্যানে নেওয়া হয় নি।

৭২ সালে দূর্গ- বিলাসপুর খন্ডে বিদ্যুৎ সংযোগ হয়ে গেলে হাওড়া থেকে একেবারে দূর্গ পর্যন্ত টানা বৈদ্যুতিক ট্রেন চলবার বন্দোবস্ত হয়ে গেল। সাথে ভিলাইতে এই সমস্ত ইঞ্জিনগুলোর রক্ষণাবেক্ষনের জন্য শেড তৈরী হওয়াতে কোন অসুবিধা রইল না। এখন শুরু হল যে সমস্ত দৈনিক বেতনভোগী কর্মচারী ছিল তাঁদের একটা গতি করার।

আগে যে দৈনিক বেতনভোগীদের ষ্ট্রাইকের কথা বলেছিলাম তাতে কিছুটা সুফল দিয়েছিল।  এই সমস্ত কর্মচারী দের জন্য একটা স্ক্রীনিংয়ের বন্দোবস্ত করে তাঁদের বিভিন্ন খালি জায়গাতে নিয়োগের বন্দোবস্ত করা হল। কিন্তু  আমার নিগ্রহের কথা কিন্তু বিভাগীয় কর্তারা ভোলেন নি। তাতে  যে তিনজন লোক সরাসরি যুক্ত ছিল তাঁদের বাতিল করে দেওয়া হল। কেন সেটা না জানালেও আমাদের বুঝে নিতে অসুবিধা হয় নি কেননা প্রাথমিক পরীক্ষা আমরাই নিয়েছিলাম। 

৭৩ সাল নাগাদ আমাকে রায়পুরের অফিস বন্ধ করার পরে নিয়ে আসা হল বিলাসপুরে। সেখানেও কাজ শেষ হয়ে গেছে কিন্তু অফিস বিল্ডিং আর বাড়তি মালের বন্দোবস্ত করা হয়নি। বিল্ডিং ভাঙ্গা হবে না অন্য কোন বিভাগকে হস্তান্তর করা হবে তা ঠিক হয়নি। বিলাসপুরের অফিস আগে যেখানে রমরমা ছিল, সেখানে তখনকার অবস্থা টিম টিম করছে।

বিলাসপুরে এসে প্রথম এক মাস আমাকে থাকতে হল টিকরাপাড়ায় এক প্রাইভেট বাড়ীতে। পাড়াটা রেলের সীমানার গায়েই আর বাসিন্দাদের প্রায় শতকরা ৯৫ প্রতিশত লোকেরা রেলের কর্মচারী। দোতলার উপরে দুটো ঘর কিন্তু টয়লেট দোতলায় ঢোকবার সিড়ির মাথায়। ঘরের পেছন দিকে এক খোলা বারান্দা। আমার বন্ধু এসে দেখে বলে দিল, এই বারান্দার দরজা তালা দিয়ে রাখ, কেননা তোমার যা শান্ত ছেলে মেয়ে তারা যে কি করবে সেটা ঠিক নেই

কলকাতায় মানুষ আর তার পরে চাকরী সুত্রে যে সব জায়গাতে থাকলাম, সেখানে অফিস আর বাড়ীর মধ্যে দূরত্ব অল্পই থাকত। কিন্তু টিকরাপাড়া থেকে আমার অফিসের দূরত্ব একটু বেশি মনে হতে লাগতে লাগল। অতএব সাইকেল শেখার দরকার। আমার বহুদিনের সহকর্মী সাইকেলের সাথে দৌড়ে দৌড়ে প্রায় ঘন্টা দেড়েক বাদে যখন মনে করল যে আমার ব্যালান্স একটু হয়েছে, তখন সে হঠাত বলে, আমি বাড়ী যাচ্ছি, তুই সাইকেল চালিয়ে আয়।

তখনো একটা উচু জায়গা পেলে সেখান থেকে সাইকেলে উঠি আর নামাটা তখনও রপ্ত হয়নি।  কিন্তু কি করা যায়। কোন রকমে চেচিয়ে লোকেদের সাবধান করতে করতে গিয়ে পৌঁছলাম। দেখি বন্ধুবর দাড়িয়ে আছেন দরজাতে। হাসি মুখ, বলে দেখলি তো তোর সাহসটাই হচ্ছিল না। এরপর কি ভাবে উঠতে আর নামতে হয় সেটা শিখতে আর কটা দিন লাগবে। মানে ৪২ বছর বয়সে আমি সাইকেলের ড্রাইভিং  লাইসেন্স, তাও লার্ণিং লাইসেন্স পেলাম। অবশ্যি পাক্কা লাইসেন্স পেতে আর দিন পনের লেগেছিল।

আমি বিলাসপুরে এলাম ৭৩ সালে আর ৭৪ সালের মে মাসে হল আবার স্ট্রাইক। আমার অফিসে অবশ্যি এবারও কিছু আঁচ পড়েনি। আমার অফিসে ষ্টাফ বলতে তখন ক্লার্ক একজন আর টেকনিকাল ষ্টাফ মাত্র দুজন, বাকী জন দশের মতন দৈনিক বেতনভোগী খালাসী। ডিষ্ট্রিক্ট অফিস থেকে ফরমান পেলাম কেউ সকালে হাজিরা ঠিক সময়ে না দিলে তার নাম লিষ্ট করে পাঠান চাই।

কাজের পাট যেখানে বন্ধ করার মুখে, সেখানে ঠিক সময়ে আর কে আসে। কিন্তু আমার মন তো তাদের নাম পাঠাতে রাজী হয় না, কারণ দৈনিক বেতনভোগীদের তো এক কথায় ছাঁটাই করা হবে। কি দরকার, তাই লিস্টে অল প্রেজেন্ট করে খবর পাঠান হল। কিন্তু আমাদের ডিষ্ট্রিক্ট অফিসে দুজন হেড ক্লার্ক ষ্ট্রাইকে যোগ দেওয়াতে, তাদের চাকরীতে ব্রেক দেখান হল। পরে অবশ্যি সে সব ঠিক করে নেওয়া হয়েছিল।

এই স্ট্রাইক সম্বন্ধে একটা জিনিষ মনে রাখতে হবে। যে আমাদের বৈদ্যুতিকরণ অফিসে দুধরণের কর্মী ছিলেন। এক আমাদের মতন লোক যারা সদ্য সদ্য কাজে যোগ দিয়েছে ( ১৯৫৮ সালের থেকেই আমাদের নিয়োগ করা শুরু হয়), আর অন্য দল হল  যারা আগে থাকতে কোন বিভাগীয় অফিসে কাজ করছিলেন, একটা প্রমোশন নিয়ে ডেপুটেশনে কাজে এসেছিলন।

কাজে কাজেই কোন ইউনিয়নের বালাই ছিল না, আর যেহেতু ইউনিয়ন নেই তাই কোন নেতাও তৈরী হয়নি। অতএব ৬০ সালের মতন এবারও বৈদ্যুতিকরণে কোন ষ্ট্রাইক হয়নি। দু একজন তাঁদের নিজস্ব বিশ্বাসে ষ্ট্রাইক করেছিলেন। তাই বৈদ্যুতিকরণ বিভাগে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ( মানে জেলে পাঠান ইত্যাদি,) নেওয়া হয়নি।

দুই ছেলে রেলের প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি হল। আর মেয়ে গেল বাড়ীর পাশেই এক মহিলার বাড়ীতে প্লে স্কুলের মতন ছিল সেখানে। কোয়ার্টার রায়পুরে যে রকম পেয়েছিলাম সেই রকমই, খালি এবার সাথে অনেকটা জমি থাকায় কিচেন গার্ডেন করতে পেরেছিলাম। আমার আগে সে সহকর্মী ছিলেম ওখানে তিনি ঐ জমিতে অড়হরের চাষ করেছিলেন। আমি এবার লাগালাম মুলো আর ঢেড়স। একটু কপিও।


আমার ছেলেরা আমার মতন বাঁদর হবে এটা জানাই ছিল, তবুও তাঁর নিদর্শন দিতে ছোট ছেলে তার টীচারের সাথে একদিন তর্ক জুড়ে দিল ওয়ান হান্ড্রেড ওয়ান লেখার জন্য কেন একের পরে দুটো শূন্য দিয়ে একশ বানিয়ে তার পাশে এক লেখা হবে না। টীচার মিস, তুমি ভুল শেখাচ্ছ। আমি বাবাকে বলে দেব। মিস তো আমাকে বলে আর হাসে। অবশ্যি ছেলের যুক্তি একেবারে ঠিক, কেননা যখন বলছে হান্ড্রেড এন্ড ওয়ান, মানে একশ আর এক,  তাই সেটা ঐ ভাবেই লিখতে হবে তো। বাড়ী ফিরে আমাকে নিরানব্বই থেকে লিখে লিখে বোঝাতে হল। মনে অবশ্যি পড়েছিল আমার ট্রান্সলেশনে তাহার আছে কেন his has হবেনা নিয়ে তর্ক। 


বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০১৫

আমার দেখা সত্তরের দশক (৩)

রায়পুরে তখন বাঙ্গালী অনেক হলেও তাঁরা সমস্ত শহরের অন্য প্রান্তে (বুড়া পাড়া এলাকাতে) থাকেন। সেখানে একটা কালীবাড়িও আছে। আগে যে আমার মাসতুতো দাদার কথা বলেছি তার শ্বশুরবাড়ীও  এই বুড়াপাড়াতেই। দুর্গা পুজা শহরে একটাই, এই বুড়াপাড়াতে হত সেই সময়, যদিও বাকী প্রায় প্রত্যেক পাড়াতেই হত নবদূর্গার আরাধনা।

আসলে আমাদের মা দূর্গার ছেলেপিলেকে নিয়ে সবশুদ্ধ এক সাথে পূজো হয় প্রধানতঃ বাঙ্গালীদেরই, অন্য সব জায়গাতে একা অম্বা মা হিসাবে সিংহবাহিনী প্রতিমার পুজা হয়। ৯ দিন ধরে সেই পূজা চলে। রাবণ দহণের ব্যপারটা দক্ষিণ ভারতে নেই, উত্তর ভারতের অবাঙ্গালী প্রধান এলাকাতেই সেটা হয়। রায়পুরেও সেটা ছিল।

রায়পুর সম্বন্ধে আর একটু কথা বলা দরকার। যেহেতু সাধারন ছত্তিশগডি লোকেরা খুবই সরল, তাই এখানে ডাক্তার মানেই হচ্ছে যে সুই লাগায়। লোকের বিশ্বাস যে সুই লাগালেই অসুখ সারে, সুই লাগানো মানে ইঞ্জেকশন দেওয়া। মিক্সচার বা ট্যাবলেটের উপর লোকের তত বিশ্বাস নেই।

কথা আছে এই ধরনের এক ডাক্তারের কাছে এক গ্রামের লোক এসেছে তার মায়ের জ্বরের জন্য ওষুধ নিতে। ডাক্তারকে আদ্ধেক কথা বলতে বলতেই সে একটা সিরিঞ্জে ডিস্টিল ওয়াটার নিয়ে ছেলের হাতে একটা সুই লাগিয়ে দিল আর ১০ টাকা নিয়ে নিল। দু দিন বাদে সেই গ্রাম্য লোকটি আবার ডাক্তারের কাছে এসে পেন্নাম ঠুকে বলল তুই খুব ভাল ডাক্তার রে, আমাকে সুই দিলি আর ঘরে বুড়ী মার জ্বরও নেমে গেল। তার কোন ব্যাথাও লাগল না। ভগবান তোর ভাল করুক। ঝড়ে কাগ মরল, আর ফকিরের কেরামতী বাড়ল।

আমাকেও এই ধরনের ডাক্তারের পাল্লায় পরতে হয়েছিল।  স্ত্রীর একটা দাঁত তোলানর দরকার পড়েছিল। তার দাঁতের একটু বিশেষত্ব ছিল যে তার রুট গুলো পাশের দিকে একটু বেঁকে থাকে। সেটা আমার জানা ছিল না। ডাক্তার প্রায় এক ঘন্টা ধরে ধ্বস্তাধস্তি করে দাঁত তো উপড়ে দিল। বাড়ি এসে দেখি রক্ত বন্ধ হচ্ছে না, আবার বিকেলেই তার কাছে নিয়ে হাজির।

এবার সিনিয়র ডাক্তার মাড়ীর অবস্থা দেখে বলে, একটু সেলাই দিয়ে দিচ্ছি। আর তার পরে আমার সামনেই সেই জুনিয়রকে প্রায় মারতে বাকী রাখে। এটা আমাকে একটু শিক্ষিত চেহারার দেখতে মনে হয়েছিল বলে হয়তো আমার জন্য করা হয়েছিল, নয়ত আবার সেই সেলাইএর সাথে আনুসঙ্গীক হিসাবে আরও কিছু তাঁকে গচ্চা দিতে হত।

টোটকা হিসাবে অল্প কাটাছেড়ার একটা ওষুধ যে মানুষের (নিজের) প্রস্রাব হতে পারে, সেটা আমি এই স্থানীয় লোকেদের কাছেই শিখলাম। আমার পুত্রদের নর্মাল বাচ্চাদের মতন রাস্তায় যা কিছু পাবে তাতে শট মারার অভ্যেস ছিল। একদিন আমার ট্রলীম্যানের সাথে অফিসের সহকর্মীর বাড়ী থেকে ফেরার পথে এই রকম শট মারার দৌলতে ছোট পুত্রের পায়ের  পাশে গেল অনেকটা কেটে। সেই ট্রলীম্যান আমার ছেলেকে বলে ঐ কাটার উপরে প্রস্রাব করতে। বাড়ী আসার পরে আমি দেখি রক্ত বন্ধ হয়ে গেছে। অবশ্যি আমি ধুয়ে ডেটল লাগিয়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু তার কাছেই শুনলাম যে ঐ টোটকা মহৌষধ প্রায়।

দুই ছেলের আরেক কীর্তির কথা না বললে ঠিক তাঁদের পরিচয় দেওয়া হবে না। বাবাকে দেখেছে ছোটখাট ইলেক্ট্রিকের কাজে কাউকে না ডেকে নিজেই ঠিক ঠাক করে নিতে। অতএব আমি অফিসে আর তাঁদের মা ছোট্ট মেয়েকে নিয়ে ঘরে শুয়ে। এনারা একটা চেয়ার টেনে নিয়ে সুইচবোর্ডের সামনে গিয়ে ঠিক করলেন একটু পগিটিব (পজিটিভ) নেগেটিব খেলা যাক। ব্যাপারটা কিছুই নয়। একটা তার দিয়ে দেখেছে টেষ্টিং করার সময় পজিটিভ নেগেটিভ এক করলে স্পার্ক হয়, সেটাই তাঁরা করে দেখতে গেছিলেন।

একটা তার কোথাও থেকে জোগাড় করে, (ভাগ্যে সেটা ইন্সুল্টেড ছিল)  চেয়ারে চড়ে,( ভাগ্য সেটা কাঠের ছিল  ) প্লাগের দুই পিনের ফুটোতে ঢুকিয়ে দেওয়া হল। বাস দড়াম করে আওয়াজ হয়ে ফিউজ উড়ে গেল আর এনারা চেয়ার শুদ্ধ হকচকিয়ে পপাত ধরণীতে। সামনের বাড়ির ভদ্রলোক দৌড়ে এসে টেনে তোলে, গিন্নী শোবার ঘরের থেকে বেড়িয়ে হাউ মাউ। আমাকে অফিস ফোন, আমি এসে বকুনী লাগিয়ে সব প্লাগ পয়েন্টের মুখ ব্ল্যাকটেপ দিয়ে বন্ধ করে রাখি। আর নয়ত তাতে যেটা চলে সেটাকে প্লাগটপ লাগিয়ে টেপ আটকে দিই যাতে খোলা না যায়।

বাঙ্গালীরা ভাতের সাথে যে তরকারী রান্না করি সেটাতে আলুর সাথে (আলু অতি অবশ্যি থাকবেই) অন্য একটা কি দুটো সব্জী নিয়ে রান্না হবে। ওখানের এক বাড়ির থেকে শেখা হল স্রেফ করলার তরকারী কি ভাবে রান্না করা যায়, যা দিয়ে ভাত মেখে খাওয়া যাবে। করলার গা একটু চেঁচে নিয়ে রাতে দইয়ের মধ্যে ফেলে দেওয়া হবে, টক দই, আর সকালে সেই করলা কেটে ঐ দইটা দিয়ে ঝোল ঝোল তরকারী। খেতে তেমন তিক্ততা থাকে না।

এতদিন আমার রান্না হত সরষের তেলে। প্রথম প্রথম ১৫ লিটার টিনের থেকে খুলে দোকান থেকে আনা হত। কিন্তু এই সময়ে সরষের তেলে শেয়ালকাঁটা ভেজালের সংখ্যা খুব বেড়ে উঠেছিল। বাধ্য হয়ে আমাকে ছোট সীলড টিনে চলে যেতে হল। নিতে শুরু করেলাম ইঞ্জিন মার্কা, কিন্তু তার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকায় বদল করে যেতে হন পোষ্টম্যান বাদাম তেলে। এই বাদাম তেলের রান্না তার পরে প্রায় প্রতি ঘরেই চলে এসেছিল তার কারণ ছিল সরষের তেলের বেশী দাম।

সাধারন দোকানপাট অধিকাংশই ছিল সিন্ধি রিফিউজী হয়ে যারা এসেছিলেন তাঁদের হাতে। পুর্ব পাকিস্তান থেকে যে সমস্ত বাস্তুহারা এসেছিলেন তাদের পুনর্বাসন করা হয়েছিল প্রধানত মধ্যপ্রদেশের বাস্তার এলাকা আর উড়িষ্যার কোরাপুট এলাকাতে। রায়পুরের কাছে ছিল অল্প দূরেই মানা।

এই মানাতে বিশ্বযুদ্ধের সময় রানওয়ে তৈরি হয়েছিল আর তার পাশে প্রচুর জায়গাতে তৈরী হয়েছিল এঁদের জন্য ট্রান্সিট ক্যাম্প। সেখান থেকে সুদূর পশ্চিম মধ্যপ্রদেশের রতলাম, নাগদা, উড়িষ্যার মাচকুন্ড, সুনাবেড়া এই সব জায়গাতে অল্প অল্প করে পরিবারদের পাঠান হত। অবশ্যি কতকগুলো জায়গাতে একসাথে অনেক পরিবারকেও পাঠান হয়েছিল যেমন উজ্জ্বয়িনী। কাজেই কৃষিজীবী বাঙ্গালী বাস্তুহারাদের হাতে কোন ব্যবসাই ছিলনা প্রায়।

এই জন্য প্রসঙ্গটা তুললাম, তার কারণ হচ্ছে এঁদের দোকানের সাজসজ্জা ছিল দেখবার মত। সাধারণ ভাবে যে সমস্ত দোকানগুলোতে চাল ডাল আটা ইত্যাদি বিক্রী হয় সেই সব দোকানেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখেছি মালপত্র গ্যালভানাইজড টিনের পাত্রে রাখা থাকত। অধিকাংশ মাল বাছাই করে পরিস্কার করে একটা চাকচিক্যময় চেহারা আনার চেষ্টা থাকত। এক দোকানির সাথে আমার এই নিয়ে কথা হয়েছিল যে এই যে বিজ্ঞাপনের দেখান জিনিষপত্রের মতন সাজানর চেষ্টা, তাতে যে খরচ হয় সেটা কি লোকের ঘাড় ভেঙ্গেই তোলা হয়।

তার উত্তর ছিল এই রকম। সেটা ঠিকই যে ক্রেতার মাথায় এর খরচ চাপবে, কিন্তু সব ক্রেতার উপরে নয়, কেননা তাহলে ক্রেতা কমে যাবে। যে জিনিষের চাহিদা বেশী, সেটা প্রায় সব দোকানেই পাওয়া যাবে। ক্রেতাকে আমার কাছে ডাকতে হবে বলে তাই তাতে দাম বিশেষ বাড়ান হবে না। আর অল্প বিক্রীর জিনিষে দামের বৃদ্ধির পরিমান বেশী হবে। আপনি আমার দোকানে চাল, ডাল আটা ইত্যাদি কম দামে নিয়ে পাচশ টাকা খরচ করলে, কি দশ টাকার এলাচ কেনার জন্য বিশ টাকা দেবেন না  অন্য দোকানে যাবেন? যুক্তিটা ঠিক বলেই আমার মনে হয়েছিল।

এই সময় আমার ছোট ভাইয়ের বিয়ে ঠিক হল। আমি ছুটির দরখাস্ত দিয়ে দিলাম আর সেটা মঞ্জুর হয়েও গেল। ট্রেনের রিজার্ভেশন করা হয়েছে। বম্বে মেলে হাওড়া, আর তার পরে শেয়ালদহ থেকে শান্তিপুরে বাবার কাছে। বিয়ে গঙ্গার অপর পাড়ে, কালনাতে, মেয়ের দাদার বাড়ীতে।


যাবার ঠিক চার দিন আগে হঠাত ভিলাই রেলের ইঞ্জিন রিপেয়ারের কারখানাতে স্ট্রাইক। রেলের ভাষায় এমার্জেন্সী, সবার ছুটি সাস্পেন্ডেড। ষ্ট্রাইক মিটলে ছুটি পাওয়া যাবে।  দিন গোনা সুরু করেছি, কবে ষ্ট্রাইক উঠে যাবে। উঠেও গেল যে দিন আমার রওয়ানা হবার কথা সেই দিন দুপুরে। কিন্তু কর্তারা তো এত সহজে এমার্জেন্সী তুলবেন না। সেই এমার্জেন্সী উঠল সরকারী ভাবে বম্বে মেল ছাড়ার আরও এক ঘন্টা বাদে। আমার সব কিছু রেডি করেও ভাইয়ের বিয়েতে যাওয়া হল   না। তখন তো ঘরে ফোন নেই, তাই খবর দেবার জন্য চিঠি লেখা, আর সেটা পৌঁছতে দিন চারেক।